আবারো প্রাণহানি ঘটিয়াছে ভূমধ্যসাগরে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে প্রকাশ, লিবিয়া ও মরক্কো উপকূল হইতে নিতান্ত সামান্য জলযানে চড়িয়া অবৈধভাবে ইউরোপে ঢুকিবার চেষ্টাকালে সমুদ্রবক্ষে ডুবিয়া মরিয়াছে প্রায় পৌনে দুইশত মানুষ। জাতিসংঘের রিফিউজি সংস্থা ইউএনএইচসিআর প্রাণহানির এই ঘটনায় ‘গভীর দুঃখ’ প্রকাশ করিয়াছে। ভূমধ্যসাগর বক্ষে একের পর এক এহেন দুর্ঘটনা চক্ষু মুদিয়া মানিয়া লওয়া যায় না বলিয়াও আক্ষেপ করিয়াছে ইউএনএইচসিআর। জাতিসংঘের এই সংস্থাটি কে বা কাহাদের লক্ষ্য করিয়া আক্ষেপ করিয়াছে—তাহা অবশ্য সংবাদমাধ্যমে পরিবেশিত খবরাদি হইতে স্পষ্ট হয় নাই। পূর্বাপর যাচাই করিলে মনে হয়, ইউরোপের উন্নত দেশগুলির উদ্দেশ্যেই ইউএনএইচসিআর এই বক্তব্য প্রদান করিয়াছে। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে ইউএনএইচসিআর-এর দুশ্চিন্তা সত্ত্বেও, ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণে অবস্থিত মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়ার মতো দেশগুলির উপকূল হইতে উত্তরপাড়ে অবস্থিত স্পেন, ইতালি এমনকি গ্রিসের মতো নড়বড়ে অর্থনীতির ইউরোপীয় দেশে ঢুকিয়া পড়িবার পথে মৃত্যুর এই মিছিল সহসা থামিবে না। তথ্যমতে, নূতন বত্সরের প্রথম ১৬ দিনে প্রায় সোয়া চার হাজার মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়া ইউরোপের উপকূল স্পর্শ করিতে সক্ষম হইয়াছে। এমতাবস্থায়, সদ্য-সমাপ্ত বত্সরটিতে ইউরোপে ঢুকিবার চেষ্টায় ভূমধ্যসাগরে ২২ শত মানুষ প্রাণ হারাইলেও, ইউরোপ প্রবেশে বেপরোয়া লোকের সংখ্যা হ্রাস পাইবে বলিয়া মনে হয় না।
অভিবাসী-শরণার্থী বিতর্কে গত কয়েক বত্সরে ইউরোপের রাজনীতিতে বড় ধরনের বদল ঘটিয়াছে। ব্রিটেনে ব্রেক্সিট, জার্মানিতে চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের ক্ষমতা হ্রাস কিংবা ইতালিতে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের ক্ষমতায় আগমনের মধ্যে ইউরোপে উদারপন্থি শক্তির দুর্বল হইয়া পড়িবার চিত্রই প্রতিভাত হয়। রাজনৈতিক চালচিত্রে এই বিশাল পরিবর্তনে সর্বাপেক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে প্রাণ বাঁচাইতে সিরিয়ার মতো দেশ হইতে ইউরোপের দুয়ারে ছুটিয়া আসা শরণার্থীরা। অবৈধ প্রবেশকারীদের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাইয়াছে যে, ইউরোপের সাধারণ লোকজন এক্ষণে বৈধ অভিবাসী কিংবা দুর্গত শরণার্থীদের ব্যাপারেও উচ্চমাত্রায় নেতিবাচক অবস্থান লইতে শুরু করিয়াছে। ইউরোপের নানান দেশের সরকারগুলি এই কারণেই একের পর এক কড়া অভিবাসন-বিরোধী আইন-প্রণয়নের পথে হাঁটিতেছে। এই সুযোগে ইউরোপের উগ্র ডানপন্থি শক্তিগুলি সকল শরণার্থীর দায় পশ্চিমা বিশ্বকেই কেন লইতে হইবে মর্মে অবান্তর প্রশ্ন তুলিয়া জনমনে ভালোভাবেই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করিতেছে।
ভূমধ্যসাগরে পলকা ডিঙা ভাসাইয়া কিংবা স্থলপথে আদম পাচারকারীদের সহায়তায় যাহারা ইউরোপে ঢুকিয়া পড়িতেছেন, তাহাদের সকলের বাস্তবতা যে এক নহে তাহা এক্ষণে জোরের সহিত বলিবার সময় আসিয়াছে। যুদ্ধাক্রান্ত দেশ হইতে পলায়ন করা মানুষজনের সহিত বিকাশমান অর্থনীতির কোনো একটি দেশ হইতে যাহারা বিপুল অর্থের বিনিময়ে অবৈধ অভিবাসন করিতে চাহিতেছেন তাহাদের কোনো তুলনা হইতে পারে না। পরিবারের জমি-জমা বিক্রয় করিয়া, পরিবারকে ঋণের জালে আবদ্ধ করিয়া জীবনের ঝুঁকি লইয়া অবৈধ অনুপ্রবেশকে নিরুত্সাহিত করাটাই সঙ্গত। যেই পরিমাণ অর্থ মানবপাচারকারীদের হস্তে তুলিয়া দেওয়া হইতেছে, সেই অর্থের বিনিয়োগ দেশের মধ্যেই ঘটাইয়া নিজের ও পরিবারের ভাগ্যোন্নয়নের চেষ্টা করিতে হইবে।
