আমি মরে গেলেও রূপবান ছবিটি বেঁচে থাকবে :সুজাতা

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২০:৫৩

মঞ্চনাটকের মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করা গুণী অভিনেত্রী  সুজাতা আজিম-এর চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় ষাটের দশকে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য ব্যবসাসফল ছবি উপহার দিয়েছেন তিনি। অর্জনের ঝুলিতে জমা করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননাসহ অসংখ্য পুরস্কার। রূপবান ছবির মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া সফল এই অভিনেত্রীর পালকে এবার যুক্ত হলো অভিনয়ে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক। অনন্য এই অর্জনসহ নিজের ক্যারিয়ারের নানাদিক নিয়ে কথা বললেন বিনোদন প্রতিদিনের সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এ এম রুবেল

অভিনয়ে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার জন্য অভিনন্দন। এমন একটি সম্মাননা পাওয়ার অনুভূতি সফল অভিনেত্রী সুজাতার কাছ থেকে জানতে চাচ্ছি—

প্রথমে আমি অফিস থেকে খবরটি পাই। তারপর টিভি থেকে জেনেছি। অসম্ভব খুশি হয়েছি এই প্রাপ্তিতে। কারণ এই পুরস্কারটি অন্যান্য পুরস্কার থেকে আলাদা। এই সম্মান অর্জনের জন্য একজন শিল্পীকে অনেক কষ্ট করতে হয়। আমি ৫৬ বছর ধরে নিয়মিত অভিনয় করছি। এতদিন পর দেশের সর্বোচ্চ এই স্বীকৃতি পেয়ে কতটা খুশি হয়েছি সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আর এজন্য  আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। তিনি আমাকে এতদূর পৌঁছে দিয়েছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই এবং কৃজ্ঞতা স্বীকার করি। কারণ উনি আমাকে এই পুরস্কারের জন্য যোগ্য মনে করেছেন। এছাড়া ১৯৫২ সালটি কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য আন্দোলনের সুতিকাগার। সেই সকল শহীদের আত্মত্যাগের জন্য এই সম্মাননা আমি পেলাম। আমি তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

দেশের এই সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পেতে কী একটু দেরি হয়েছে বলে মনে করেন?

না না, আমার তা মনে হয় না। আমার মনে হয়, যখন যেটা কপালে থাকে তখন সেটাই মেনে নেওয়া উচিত। তাছাড়া আমার আরো আগে পাওয়া উচিত ছিল কি-না সেটা আমি বিচার করতে চাই না। সেটা দেশের মানুষ মূল্যায়ন করবেন। জীবনে এত বড় একটি সম্মান পেলাম এতেই আমি অনেক খুশি। মনে হচ্ছে দুনিয়ার সবকিছু পেয়ে গেছি।

আপনার প্রথম চলচ্চিত্র ‘রূপবান’ দেশের চলচ্চিত্রের জন্য টার্নিং পয়েন্ট ছিল। এই চলচ্চিত্রটি আপনাকে সুজাতা বানিয়েছে। এ সম্পর্কে জানতে চাই—

‘রূপবান’ শুধু চলচ্চিত্রের মোড় ঘুরিয়েছে সেটা নয়, এই ছবিটি কিন্তু আমাদের ভাষা আন্দোলন নিয়ে নির্মিত। যখন এদেশে উর্দু ছবির ছড়াছড়ি তখন লোকসংস্কৃতির এই ছবিটি নির্মিত হয়। ছবিটিতে একজন বিদ্রোহী নারীর জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটি এমন একটি ছবি যে, যতদিন আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থাকবে ততদিন এই ছবিটি বেঁচে থাকবে। আমি মরে গেলেও আমার রূপবান ছবিটি বেঁচে থাকবে।

আপনাদের সময় মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রে আসা ততটা সহজ ছিল না। অনেকেই এটাকে নেতিবাচকভাবে নিতেন। আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

আমার ক্ষেত্রে এমন কোনো প্রতিবন্ধকতা আসেনি। আমার অভিজ্ঞতা অনেক ভালো ছিল। কারণ আমার কোনো দুরূহ পথ পাড়ি দিতে হয়নি। আমি মঞ্চে অভিনয় করেছি। একদিন সালাউদ্দিন সাহেব মঞ্চে নাটক দেখতে এসে তার ‘ধারাপাত’ ছবির জন্য আমাকে সিলেক্ট করেন।

কোন সময়টা আপনার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বলে মনে করেন?

আমার ক্যারিয়ারের টানিং পয়েন্ট হিসেবে অনেকগুলো কাজকেই ধরা যায়। তবে নিঃসন্দেহে ‘রূপবান’ ছবিটি আমাকে সুজাতা হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত ‘জীবন থেকে নেওয়া’ ছবিটিও আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। এমন আরো বেশকিছু কাজ রয়েছে যেগুলো আমার সফলতার পথকে মসৃণ করেছে।

আপনার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে শ্রেষ্ঠ কাজটি কী করে ফেলেছেন বলে মনে করেন?

আমি দীর্ঘদিন অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত আছি। যতদিন বাঁচবো অভিনয়ের সঙ্গেই বাঁচতে চাই। এর পাশাপাশি প্রতিবছরই আমার লেখা বই প্রকাশিত হচ্ছে। এবারের বইমেলাতেও আমার ৩টি বই প্রকাশিত হবে। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আসলে আমি ভালো ভালো কাজ করে যেতে চাই।

অভিনেত্রী সুজাতার প্রাপ্ত-অপ্রাপ্তির বিষয়ে জানতে চাই—

আমার অপ্রাপ্তি বলতে কিছু নেই। আমি একজন পরিপূর্ণ মানুষ। আমার দুঃখ বলেন বা অপ্রাপ্তি বলেন, আমি সবসময় পজেটিভ চরিত্রে কাজ করে এসেছি। তবে আমি যদি নেগেটিভ চরিত্রে সুযোগ পেতাম তবে আরো বেশি ভালো করতে পারতাম বা আরো তুষ্ট হতাম। আর একটা দুঃখ হচ্ছে, আমি যে সময় আমার ছেলেকে চলচ্চিত্রে নিয়ে আসবো সেই সময়টাতে চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি ছিল। তাই ছেলেকে অভিনয়ে আনতে পারিনি।

আপনার সমসাময়িক ববিতা, সূচন্দা’সহ অনেকের সঙ্গে কাজ করেছেন। কারো সঙ্গে প্রতিযোগিতা বা ঈর্ষার কোনো গল্প আছে কী?

না, আমি শুধু ববিতা বা সূচন্দার সঙ্গে না, সেসময় অনেকের সঙ্গেই কাজ করেছি। তবে কারো সঙ্গেই আমার কোনো ঈর্ষা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল আমাদের মাঝে। আমরা যে যার জায়গা থেকে ভালো কাজ করার চেষ্টা করে গেছি।  বলতে পারেন, আমাদের সময় কাজের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ছিল, কিন্তু মন-মানসিকতায় প্রতিযোগিতা ছিল না।

একজন সফল অভিনেত্রী হিসেবে দেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান প্রেক্ষাপটকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

দেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তো আমরা সবাই জানি। আমরা যখন চলচ্চিত্রে আসি তখন উর্দু ছবির ভিড়ে আমাদের ছবির নাজুক অবস্থা ছিল। পরে কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্রে স্বর্ণালি যুগ চলে আসে। সেসময় অনেক ব্যবসাসফল ছবি নির্মাণের পাশাপাশি অসংখ্য স্টার তৈরি হয়েছে। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা ঢুকে ইন্ডাস্ট্রিকে অনেকটা পিছিয়ে দেয়। এখন কিন্তু সেই অবস্থা পেরিয়ে এসেছি আমরা। অনেক ভালো ছবি নির্মিত হচ্ছে। এখন ছবি দেখার মাধ্যমেরও পরিবর্তন হচ্ছে। দর্শক চাহিদার কথা চিন্তা করে শিল্পী-নির্মাতারাও সেদিকে ঝুঁকছেন। আমার মনে হয় তাড়াতাড়ি ঘুরে দাঁড়াবে আমাদের চলচ্চিত্র।