করোনার প্রভাবে বাংলাদেশে যুব বেকারত্বের হার দ্বিগুণের অধিক বৃদ্ধি পাইবার আশঙ্কা করিয়াছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম এক-চতুর্থাংশ তরুণ জনগোষ্ঠী বেকারত্বের কশাঘাতে দীর্ণ হইতেছেন। কেবল বাংলাদেশ নহে, বেকারত্বের সমস্যা সারা বিশ্বেই বৃদ্ধি পাইয়াছে। একটু ভালো করিয়া বাঁচিতে কিংবা একটুখানি নিয়মিত রোজগারের আশায় মানুষ গ্রাম ছাড়ে, চেনা পরিধি ত্যাগ করে। কিন্তু করোনা আসিয়া সকল কিছু উলটপালট করিয়া দিয়াছে। চাকুরির প্রলোভন দেখাইয়া প্রতারণার ঘটনা আগেও ছিল, তবে তাহার মাত্রা সম্প্রতি বাড়িয়াছে বলিয়া মনে হইতেছে। অন্তত প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ হইতে ইহাই প্রতীয়মান হইতেছে। বাংলাদেশের পুলিশ বলিতেছে, গত বত্সর এই সংক্রান্ত গড়ে প্রতিদিন সাতটি মামলা দায়ের করা হইয়াছে। প্রতারকদের পকেটে গিয়াছে দেড় হাজার কোটি টাকা।
কেবল বাংলাদেশে নহে, প্রতারণার জাল বিছানো রহিয়াছে সমগ্র উপমহাদেশেই। একটি চাকুরি পাইতে মানুষ কতখানি মরিয়া হইতে পারে, তাহার উদাহরণ মিলিবে ভারতের একটি প্রতারকের কর্মকাণ্ডে। কয়েক মাস পূর্বে চেন্নাইয়ের এক প্রতারক চাকুরি পাইবার শর্ত হিসাবে চাকুরিপ্রত্যাশী নারীদের নিকট মোবাইল ফোনে দিগম্বর ছবি দাবি করিত। চাকুরি পাইবার আশায় অনেক নারী তাহা দিয়াও দিত। এইভাবে দেশটির ১৬টি রাজ্যের প্রায় ৬০০ নারীর ছবি এবং ভিডিও ঐ প্রতারকের নিকট চলিয়া আসে, যাহা দিয়া সে পরবর্তী সময়ে পুনরায় ব্ল্যাকমেল করিয়া কয়েক লক্ষ টাকা হাতাইয়া লইয়াছে। যদিও এই ধরনের বেশির ভাগ প্রতারকের ঠাঁই হয় জেলখানায়। বাংলাদেশেও সবচাইতে অধিক প্রতারণার শিকার হন শিক্ষিত বেকার এবং উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী ছেলেমেয়েরা। তাহারা ঢাকার অলিতেগলিতে বাসে-ট্রেনে লিফলেট, ব্যানারে লোভনীয় চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখিতে পান। কোনো অভিজ্ঞতার দরকার নাই, পার্টটাইম কাজ, বেতনও চলনসই। বড় বড় করিয়া ফোন নম্বর দেওয়া থাকে। ইহা যেন মেঘ না চাহিতেই শ্রাবণের বারিধারা! একবার ফোন করিলেই কেল্লা ফতে। সাক্ষাত্কার দিলেই চাকুরি নিশ্চিত! কয়েক হাজার টাকা চাকুরির জামানত রাখা হয়। অতঃপর চাকুরির দিন গিয়া দেখা যায়, ঐ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানই নাই। জামানতের পুরা টাকাটাই পানিতে চলিয়া যায়। চাকুরির নামে প্রতারণার ইহাই একমাত্র খবর নহে। এই সকল প্রতারক কখনো ব্যক্তিগতভাবেও চাকুরিপ্রার্থীদের সহিত যোগাযোগ করেন, কখনো পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়া চাকরিপ্রার্থীদের আকৃষ্ট করিয়া থাকেন। চাকুরি দেওয়ার বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য করিতে তাহারা কিছুদিনের জন্য অভিজাত এলাকায় জৌলুসপূর্ণ অফিস ভাড়াও লইয়া থাকেন। বিশ্বস্ত লোকজনও নিয়োগ করেন, যাহাতে বেকার যুবকরা সহজেই আকৃষ্ট হইয়া ফাঁদে পা দিতে পারে। অতঃপর চাকরিপ্রার্থীদের নিকট হইতে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতাইয়া লইয়া সেইখান হইতে পাততাড়ি গুটাইয়া তাহারা অন্যখানে চলিয়া যান।
যাহারা প্রতারণার শিকার হন, তাহারা এই মর্মে এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যদের সতর্ক করিতে পারেন। এমনকি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করিয়া পুলিশের নিকটও অভিযোগ জানাইতে পারেন। বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হইলে আইনের আশ্রয় নেওয়া উচিত। প্রবঞ্চক, অন্যায়কারীদের অন্যায় সহ্য করা উচিত নহে। মনে রাখিতে হইবে অন্যায় সহ্য করাও এক ধরনের অপরাধ। ইহাতে প্রতারকরা পার পাইয়া যান। বর্তমান আইন অনুযায়ী প্রতারণার মামলা দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকে দায়ের করা যায়। একই সঙ্গে, আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া কাজ করিতে হইবে। ঢাকার অলিতেগলিতে, বাসে-ট্রেনে লিফলেট, ব্যানারে বড় বড় ফোন নম্বর দিয়া যেই সকল প্রতারক চাকুরি দেওয়ার ব্যবসায় ফাঁদিয়া বসিয়াছেন, তাহাদের ধরা খুব বেশি কঠিন নহে। আমরা তো বরং মনে করি, এইভাবে প্রকাশ্যে প্রতারণার বিজ্ঞাপন দিয়াও বেশির ভাগ প্রতারকের পার পাইয়া যাওয়াটাই বিস্ময়কর। ইহা কি বাংলাদেশ বলিয়াই সম্ভব?
