কয়েক দিন আগে ঢাকা-সিলেট রেলপথে একটি তেলবাহী ট্রেনের ২১টি বগির মধ্যে ১০টি লাইনচ্যুত হয়। এই রেলপথটি বহুদিন ধরিয়াই ঝুঁকিপূর্ণ। এক বছরে এই পথে ৯ বার বগির লাইনচ্যুতি ঘটিয়াছে। জরাজীর্ণ লাইনের কারণেই এখানে বারংবার দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। ২০১৯ সালে দুইটি দুর্ঘটনায় এই রেলপথে নিহত হন ২১ জন যাত্রী। কারণ এই লাইনটি ১২৫ বত্সরের পুরাতন। ব্রিটিশ আমলে ১৮৯১ সালে এই লাইনটি তৈরি হয়; কিন্তু এতদিন ধরিয়াও সেইখানে কার্যকর সংস্কার সাধিত হয় নাই—যাহা দুঃখজনক। ইত্তেফাকের রিপোর্টে বলা হইয়াছে, এই রেলপথের প্রায় স্থানে স্লিপার, পাথর, ফিসপ্লেট বা নাট-বল্টু নাই। তাই ঢাকা-সিলেট রেলপথের এই অংশে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা জরুরি। বর্তমানে রেলপথের আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রহিয়াছে। সাম্প্রতিক কালে রেলের অনেক উন্নয়নও হইয়াছে। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর অনেক রেললাইন বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। সেইগুলি আজ আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের স্বার্থে পুনর্নির্মিত বা সংস্কার করা হইতেছে। রেলওয়েতে যোগ হইতেছে মেট্রোরেল। ইহার পরও দেশের অনেক রেলপথের অবস্থাই শোচনীয়। এই সকল পথে ট্রেন চলে ধীর গতিতে। বিশেষ করিয়া সিলেট-আখাউড়া রেলপথের ১৭৯ কিলোমিটারের মধ্যে ১৩টি সেতু অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এই সেতুগুলিরও দ্রুত সংস্কার করা আবশ্যক।
বর্তমানে রেলে ৪৮টি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান। তাহার পরও বিদ্যমান ২ হাজার ৯৫৫ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে আড়াই হাজার কিলোমিটারই জরাজীর্ণ এবং ৮০ শতাংশ রেলব্রিজ ঝুঁকিপূর্ণ। রেলের ২৭৮টি ইঞ্জিনের মধ্যে ৫৪ শতাংশের বয়স ৩৫ হইতে ৬৩ বত্সর। একই অবস্থা বগিরও। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, যেই সকল খাতে প্রকল্প নেওয়া হইয়াছে তাহার অনেকই কম গুরুত্বপূর্ণ। রেলের পুরাতন-জরাজীর্ণ লাইন ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজের সংস্কারকে প্রাধান্য দেওয়া হয় নাই। রেলের অনেক লেভেল ক্রসিং মৃত্যুফাঁদস্বরূপ। অনেক স্থানে কোনো গেটম্যান নাই। থাকিলেও তাহারা স্থায়ী কর্মচারী না হওয়ায় তাহাদের দায়িত্বে অবহেলা লইয়া প্রায়শ প্রশ্ন উঠে। গত এক দশকে সরকার রেলের উন্নয়নে ৭৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করিয়াছে। দুই দফা যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের ভাড়া বাড়ানো হইয়াছে। ট্রেনের এসি টিকিটের মূল্য এখন বিলাসবহুল বাসের প্রায় সমান। ইহার পরও গত অর্থবত্সরে রেলের লোকসান হইয়াছে ২ হাজার কোটি টাকা। ইহার কারণ হিসাবে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মকে দায়ী করা হইতেছে। রেলকে গতিশীল করিবার জন্য নানা পরিকল্পনা গ্রহণের কথা শুনা যায়; কিন্তু বাস্তবে তাহার কতটা প্রতিফলন হইতেছে সেইটাই আজ বড় প্রশ্ন হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
রেল অত্যন্ত আরামদায়ক একটি গণপরিবহন। জনবহুল বাংলাদেশে রেলের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ একান্ত জরুরি। এই বিবেচনায় রেলওয়েতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। ২০০৯ সালের পর হইতে রেলওয়েতে অর্থায়ন বাড়িয়াছে ও গত পাঁচ-ছয় বত্সরেই ১০ হাজারেরও অধিক লোক নিয়োগ দেওয়া হইয়াছে। একসময় রেলওয়ের উন্নয়ন লইয়া সরকারের মনোযোগ ছিল কম। এখন রেলওয়ের উন্নয়ন গুরুত্ব পাইয়াছে বটে, তবে যাত্রী বৃদ্ধি, আয়বর্ধক ও লাভজনক—এই তিন বিবেচনায় রেলের প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন। বাড়ানো প্রয়োজন রেলওয়েতে কনটেইনার মালামাল পরিবহনের হার। সরকারি গুদাম ও বন্দর-ঘাটের সহিত সংযোগকারী যেই সকল রেলপথ বন্ধ হইয়া গিয়াছে তাহা পুনরায় চালু করিতে হইবে। রেলপথ চালু করিতে হইবে অবশিষ্ট ২০ জেলায়ও। তুলিয়া দিতে হইবে মিটারগেজ লাইন। দূর করিতে হইবে সিগন্যাল সিস্টেমের ত্রুটি। মোটকথা, রেলে সরকারি-বেসরকারি যৌথ ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়া হইলে রেলওয়ে তাহার হারানো গৌরব ও ঐতিহ্য ফিরাইয়া পাইতে পারে।
