বাংলাদেশের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন একটি অনন্য ঐতিহাসিক ঘটনা। ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে দিয়েছে নতুন পথের সন্ধান, নির্মাণ করেছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নতুন সড়ক। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের সংস্কৃতির ভুবনে ভাষা আন্দোলনের মতো প্রভাবসঞ্চারী কোনো অনুষজ্ঞ নেই। বাংলাদেশের সাহিত্যে ভাষা আন্দোলনের প্রতিফলন ঘটেছে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায়। বাংলাদেশের এমন কোনো লেখক হয়তো নেই? যিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে একটি কবিতা, নাটক, ছোটগল্প, উপন্যাস, ছড়া কিংবা প্রবন্ধ লেখেননি। ভাষা আন্দোলনের যৌথ চেতনা আমাদের লেখকদের সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছে। আমাদের সাহিত্যের অন্যান্য শাখা অপেক্ষা কবিতাতেই ভাষা আন্দোলনের প্রতিফলন ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত কবিতার সংখ্যা এখন হিসাবের বাইরে।
ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে আমরা প্রথমেই উল্লেখ করতে পারি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ গ্রন্থে সংকলিত কবিতাগুচ্ছের কথা। ঐ সংকলনে আছে ১১টি কবিতা। আর কবিরা হলেন—শামসুর রাহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল গনি হাজারী, ফজলে লোহানী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আনিস চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, জামালুদ্দিন, আতাউর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক এবং হাসান হাফিজুর রহমান। এসব কবির সম্মিলিত শব্দস্রোতে উদ্ভাসিত হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারির কালজয়ী তাত্পর্য।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ওপর প্রথম কবিতা রচনা করেন মাহবুবুল আলম চৌধুরী। তার রচিত ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতায় তত্কালীন ভাষা আন্দোলনের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলার মানুষের বিদ্রোহ, ক্ষোভ, গ্লানি, হাহাকার, যন্ত্রণা, প্রতিবাদ, দাবি আদায়ের এক শর্ত বাণী। ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের শোককে শক্তিতে পরিণত করে খুনিদের ফাঁসির দাবিতে রমনার কৃষ্ণচূড়ার তলায় প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর এ কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে—
‘এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে/রমনার ঊর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলায়/যেখানে আগুনের ফুলকির মতো/এখানে যেখানে জ্বলছে অসংখ্য রক্তের ছাপ/যেখানে আমরা কাঁদতে আসিনি।’
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির স্মৃতি এবং ২২শে ফেব্রুয়ারি শফিউরের হত্যাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য শফিউরের পিতা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে; কিন্তু অত্যাচারী পাকিস্তানবাহিনী তা ধ্বংস করে দেয়। কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ এই ঘটনার প্রতিবাদে রচনা করেন ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ নামক কবিতা। এই কবিতায় কবি এই অপশক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে অধিকার আদায় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। যেভাবে আজ আমাদের মিনার ভেঙেছে ঠিক একইভাবে আমরা ৪ কোটি পরিবার সংঘবদ্ধ হয়ে পরাশক্তির দেওয়ালকে চূর্ণ করব—
‘ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক/একটি মিনার গড়েছি আমরা/চারকোটি পরিবার।’
একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত স্মৃতিকে স্মরণ করে কবি আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন একুশে ফেব্রুয়ারি কবিতা। ভাষা শহিদদের এ আত্মত্যাগ ভুলার নয়
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি/ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি।’
দীর্ঘদিনের ইতিহাস, ঐতিহ্য জীবনাচরণ, সংস্কৃতি, বিনোদন এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বাংলাভাষাকে কেড়ে নিতে চায় পাকিস্তানবাহিনী। কবি শামসুর রাহমান তার রচিত বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ কবিতায় বাংলা ভাষায় রোমান হরফ চালুর প্রচেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ জানান—
‘তোমাকে উপরে নিলে বলো তবে, কী থাকে আমার/উনিশশো বায়ান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি/বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়ষী।’
নিজ ভাষাকে পাওয়ার আকুলতায় মানুষ কীভাবে নিজের ভাইবোন, সন্তানকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে যে কোনো দিন। কবি সুফিয়া কামাল এমনই একটি ভাষা আন্দোলনের ওপর কবিতা লেখেন যার নাম ‘এমন আশ্চর্য এই দিন’।
এইভাবে ভাষা আন্দোলন আমাদের সামগ্রিক কবিচৈতন্যে নিয়ে আসে নতুন মাত্রা। ভাষা আন্দোলন হয়ে ওঠে বাংলাদেশের কবিদের অবিনাশী শিল্প আয়োজন। যখনই শৃঙ্খলমুক্তির প্রয়োজন আসে, যখনই প্রয়োজন শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারণ, তখনই ভাষা আন্দোলন আর শহিদেরা দ্রোহের ভূমিকায় হয় অবতীর্ণ। ভাষা আন্দোলনের মৌল চেতনাকে মর্মে ধারণ করে আমাদের কবিতায় লেগেছে নতুন হাওয়া। বস্তুত, ভাষা আন্দোলনই আমাদের সাহিত্যিকদের সামনে তুলে ধরে জাতিসত্তার মৌল পরিচয়, আমাদের গন্তব্যের সঠিক ঠিকানা।
n লেখক :প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, ড. মাহবুবুর রাহমান মোল্লা, কলেজ, মাতুয়াইল, ডেমরা, ঢাকা
