সরকারি কর্মচারীদের নবম থেকে তদূর্ধ্ব গ্রেডের সব পদে পদোন্নতির জন্য পরীক্ষার সুপারিশ করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের নবম গ্রেড থেকে তদূর্ধ্ব সচিব গ্রেডের সব কর্মচারীর পদোন্নতির জন্য সুনির্দিষ্ট সিলেবাসের আওতায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া উচিত। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ে পদোন্নতির ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন বাস্তবসম্মত। দুর্নীতি দমন কমিশন ইতিমধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতির ব্যবস্থা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছে।
গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ এসব কথা বলেন। ব্রিফিংয়ে দুদক চেয়ারম্যান প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশ ও সুপারিশ তুলে ধরেন। এ সময় দুদক কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান ও এ এফ এম আমিনুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি দমনে সরকারি সংস্থা ও বিভাগ যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে মন্তব্য করে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, দুদক প্রতি বছর দুর্নীতি প্রতিরোধে এবং বন্ধের জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সুপারিশ করছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর দুর্নীতি বন্ধে দুদকের সুপারিশগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। এ কারণে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিবেদনে নির্দিষ্টভাবে ১৪টি খাত বা বিষয় ছাড়াও আরো ৯টি খাতভিত্তিক সুপারিশ পেশ করা হয়েছে। যদিও কমিশন মনে করে, এসব সুপারিশ স্বতঃসিদ্ধ কোনো বিষয় নয়, তবে এ কথাও ঠিক এ জাতীয় সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে সরকারি পরিষেবার বিজনেস প্রসেস রি-ইঞ্জিনিয়ারিং হয়। ফলে অনিয়ম-দুর্নীতির পথ কিছুটা হলেও কঠিন হয়।
মাঠ পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত দুর্নীতি রয়েছে বলে মন্তব্য করে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধি। এ অপরাধ বৈশ্বিক। তবে মাত্রার তারতম্য রয়েছে। বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা রয়েছে, এ কথা অস্বীকার করা সমীচীন হবে না। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সরকারি পরিষেবা সর্বোপরি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে দুর্নীতির নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ থেকে পরিত্রাণের সংক্ষিপ্ত কোনো পথ হয়তো নেই। তবে কোনোভাবেই দুর্নীতির কাছে পরাজিত হওয়ার সুযোগ নেই। সুশাসন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য আমাদের দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা জরুরি। কালোটাকা সাদা করার প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে ঘুষ বৈধ করার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। ঘুষের টাকা সাদা করাটা অনৈতিক ও বিব্রতকর বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পুলিশের দুর্নীতি বন্ধে থানাগুলোতে পুলিশ ক্যাডার সার্ভিস থেকে অফিসার নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইকবাল মাহমুদ। তিনি বলেন, দেশের পুলিশি সেবার প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে থানা। এসব থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশের পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা। থানা থেকে সাধারণ জনগণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সেবা পাচ্ছেন না—এমন অভিযোগ প্রায়শই পাওয়া যায়। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ের অধিকাংশ দপ্তরেই বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। এ প্রেক্ষাপটে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পুলিশ) ক্যাডারের সহকারী পুলিশ সুপার অথবা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের পদায়নের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এটা হলে দুর্নীতি অর্ধেক কমে যাবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবেদনটিকে বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছে। তিনি এনজিও এবং নাগরিক সমাজকে গঠনমূলক সমালোচনা করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, একটি বড় এনজিও আছে যেটি দুর্নীতি, শিক্ষা বা রাজনীতি, যে কোনো বিষয়েই সমালোচনা করে। সেগুলো সমাধানের জন্য দৃশ্যমান কিছুই করে না।
সম্প্রতি আলজাজিরা একটি প্রতিবেদন সম্প্রচার করেছে, যাতে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। এ প্রতিবেদনের বিষয়ে দুদক অনুসন্ধান বা তদন্ত করবে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, আলজাজিরার তথ্যচিত্রটি আমি দেখেছি। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, এসব অভিযোগের বিষয়ে তারা কী প্রমাণ পেশ করে। আল জাজিরা যা করেছে তা তাদের একান্ত নিজস্ব বিষয়। প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগসমূহের বিষয়ে তারা কী তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করে, সে পর্যন্ত অপেক্ষা করব আমরা। তিনি বলেন, দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা ঐসব ব্যাপারে নথি ও তথ্যপ্রমাণ আমাদের কাছে নেই। যদি তথ্যপ্রমাণ পাই তখন দেখব।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর দুদকের কাছে মোট ২১ হাজার ৩৭১টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ৭১০টি অভিযোগ তদন্তের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দুদক মোট ২৬৩টি মামলা দায়ের করেছে এবং চার্জশিট দিয়েছে ২৬৭টির। এছাড়াও ২০১৯ সালে ৬৩ শতাংশ ক্ষেত্রে শাস্তি নিশ্চিত করতে পেরেছে দুদক। এছাড়া ২০১৯ সালে ২০১৮ সাল অপেক্ষা চার্জশিট অনুমোদনের সংখ্যা সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। অপর দিকে ২০১৯ সালে ১৬টি ফাঁদ মামলা পরিচালনা করা হয়েছে। ফাঁদ মামলার সংখ্যা গত বছরের চেয়ে কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফাঁদ মামলা পরিচালনার পাশাপাশি কমিশনের অভিযোগ কেন্দ্রের হটলাইন-১০৬-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিরোধমূলক দুর্নীতিবিরোধী সফল অভিযান পরিচালনা করেছে।
