বখাটেদের দলে মেম্বারের ছেলে জাকিরুলও আছে। সে-ই নেতৃত্ব দেয়। জাকিরুল বার দুই ইন্টার ফেল করে এখন পড়ালেখা শিকেয় তুলেছে। ফলে টিজ করা ছাড়া তার কোনো কাজ নেই। এতে নাকি ভীষণ মজা পায়। চার-পাঁচজন বন্ধুও জুটে গেছে মজা করতে।
মজা করতে গিয়ে একটি ঘটনা ঘটল। ক্লাস টেন-এর স্বর্ণা ফিরে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিল। জাকিরুল আবারো সিটি বাজাল। অন্য মেয়েরা দৌড়ে ব্রিজ অতিক্রম করলেও স্বর্ণা দাঁড়িয়ে থাকল। জাকিরুল কাছে এসে বলল, তোর হাসিডা সোন্দর। আবার একটু হাসেক তো?
স্বর্ণা বলল, তোমার শিস বাজানো সোন্দর। আবার একটু বাজাও তো?
জাকিরুলের বন্ধুরা হইহই করে উঠল।
এরপর থেকে জাকিরুলরা আর ব্রিজে এসে দাঁড়ায় না। হঠাত্ একদিন বিকালে স্বর্ণা গিয়ে হাজির হলো জাকিরুলদের বাড়ি। ওর হাতে একটি কাপড়ের পুটলি। জাকিরুলের মাকে বলল, চাচি, চইলে আলাম। আপনাগের বাড়ি তো চিরদিনের জন্যি থাকতি হবি।
জাকিরুলের মা অবাক হয়ে তাকায় স্বর্ণার দিকে। স্বর্ণা বলে, অমন হা কইরে দেকছেন কী? আমি তো বাঘ-ভালুক না, মানুষ। বউ তো একদিন হওয়াই লাগবি। কোন গাঁয়ের কোন ছাওয়াল আসপে ঠিক নাই। তাই এই চেনাজানার মধ্যি ঢুইকা পড়তিছি। মানে আপনার ছাওয়ালেরে বিয়া করতি চাইতিছি। খাড়ান, একটু সালাম করি। আমি কিন্তুক আর চাচি ডাকুম না। ‘মা’ কইয়া ডাইকবো, নয় ‘আম্মা’ কইয়া।
পায়ে হাত রাখতেই জাকিরুলের মা চেঁচিয়ে ওঠে, কী কইলি আমার পোলার বউ হবি? যা, বাইর হ আমার বাড়ি থেইকা? দূর হ?
: চ্যাতেন ক্যান আম্মা? আপনার পোলার লগে বিয়া হইলে এই বাড়িতে আমার অধিকার নাই?
: যা বাইর হ।
: যদি আপনার সতীন হই?
: কী কইলি তুই? আমার সতীন হবি? দাঁড়া, এহনই আমি কল করতেছি।
জাকিরুলের মা ঘরে ঢুকে মোবাইলফোন বের করে এনে বোতাম টিপতে থাকে। স্বর্ণা ততক্ষণে বারান্দায় উঠে পাটি পেতে বসে পড়েছে। ওপাশ থেকে ‘হ্যালু’ বলতেই জাকিরুলের মা বলল, ও জাকিরুলের বাপ তুমি কই? বাজারঘাট সব ফেলায়া এহনই বাড়ি চইলে আসো। কী হইছে তা আইলেই বুঝতি পারবা। তোমার পোলার বউ আইছে। সে নাকি তোমারও বউ হইতি পারে।
ফোনে কথা শেষ হলে স্বর্ণা বলল, তাইলে আমি মেম্বর চাচার আসা পর্যন্ত এইখানেই বসব নাকি ঘরে গিয়া বসব?
: উঠানে গিয়া ব হারামজাদি।
: এত রাইগেন না। পুলিশ আইসবো। থানায় খবর দিয়া আইছি। তার চাইতে ভালোমন্দ রান্নাবাড়া করেন, রাইতে খাব।
: উঁ—রাইতে খাব? আহ্লাদ কত?
জাকিরুলের মা আর সেখানে দাঁড়ায় না। স্বর্ণা হাসতে থাকে।
সন্ধ্যার একটু আগে জাকিরুলের বাবা এলো। তার কাছে খবর আছে জাকিরুল পালিয়েছে। সে নরম সুরে স্বর্ণাকে বলল, আচ্ছা মা তোমার হইছে কী খুইলা কও তো?
স্বর্ণা বলল, অত ম্যা-ম্যা করতেছেন ক্যান? জাকিরুল যদি বিয়ে করে তার বউ, নইলে আপনার বউ...।
: ছিঃ ছিঃ ছিঃ। এইডা কেমুন কতা?
: এহন তো কইবেনই এইডা কেমুন কতা?
স্বর্ণার গলায় কিসের ইঙ্গিত! জাকিরুলের মা জিগেস করল, মেম্বর কী করছে?
: সেইডা তারেই জিগান।
: তুমি কইলে দোষ কী?
: আপনার পোলা বখাটে হইলেও মানুষ খারাপ না। আমি শর্ত দিছিলাম রাস্তাঘাটে মাইয়াগুলানরে বিরক্ত করতি পাইরবে না। সে আমার কথা মানছে। কিন্তুক এহন বলে কি না মেম্বরের পোলা হইয়া দিনমজুরের মাইয়ারে বিয়া করতি পাইরবে না। আমিও বিয়ার কথা তুলতাম না যদি মেম্বর সাব আমারে একটু সাহায্য কইরতো।
: তার মানে কী?
: মেম্বর সাবরে জিগান। আমি এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপের জন্য টাকা জোগাড় করতি পারি নাই। মেম্বর সাবের কাছে গিছলাম একটু সাহায্য চাইতি। সে বলে কি না রাইতে দেহা করতি। রাইতে দেহা করার মানে তারে জিগান?
জাকিরুলের মা মেম্বারের দিকে তাকালে মেম্বার মুখ নিচু করে ফেলল। মেম্বারকে উদ্দেশ্য করে বলল, এহন তো দেখতাছি তুমি হইলে আসল বখাটে।
অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য
