আসছে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় অনেক আগে থেকেই তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। করোনাকালের বাজেট কেমন হবে এখনো কিছু ধারণা করা না গেলেও গত অর্থবছরের মতো হবে বলে মনে হচ্ছে না। গত অর্থবছরের বাজেট ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার। ২০২১ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অনেকটা ঘুরে দাঁড়াবে বলে অনেকে মনে করছেন। করোনা মোকাবিলা সক্ষমতায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম ও বিশ্বে ২০তম। জাতিসংঘের হিসাব মতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৫.১ শতাংশ। সরকারি হিসাবমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫.২৪ শতাংশ। যদিও জাতিসংঘ বলছে এ হার ছিল ৪.৩ শতাংশ। কিন্তু ‘দি ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের’ এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চলতি বছরে প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৫.৮ শতাংশে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরই প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে আমাদের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.৪ শতাংশ। করোনা অতিমারির কারণে কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় যে ব্যাঘাত ঘটেছে তা কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় হয়তো লাগবে। বিশ্বব্যাপী করোনা অতিমারির ফলে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলেও বাংলাদেশ অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে বলে আপাতদৃষ্টিতে অনেকেই মনে করছেন। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকগুলো আমাদের তা মনে করিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের বড় পাঁচটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের দেশের মধ্যে ভারতের প্রবৃদ্ধি হবে ৭.৬ শতাংশ। ভারতের পরপরই থাকবে বাংলাদেশ। ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮.৫১ শতাংশ। ২০২১ থেকে ২০২৫ এ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে ১ কোটি ১৩ লাখ।
বর্তমান সরকারের রূপকল্প-২০২১-এর মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে নিয়ে যাওয়া। ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ এর ওয়ার্ল্ড লিগ টেবিল ২০২১ রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন যে ধরনের অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহত্ অর্থনীতির দেশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়ে ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে; যা ২০০৬ সালে ছিল মাত্র ৫৪৩ ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড পরিমাণ, ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। করোনা মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এসব প্রণোদনা সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা যায়নি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্পে। দেশে এ খাতে উদ্যোক্তার সংখ্যা ৭০ লাখ এবং জিডিপিতে অবদান ৩৩ শতাংশ। কিন্তু এ খাতে প্রণোদনার মাত্র ৪০ শতাংশ বিতরণ হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়। অথচ আমরা কমবেশি সবাই জানি যে, ক্ষুদ্র্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্প খাতেই কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সবচেয়ে বেশি। এ খাতে স্বল্প পুঁজিতে অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়। দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ১০.৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুসারে করোনার প্রভাবে এ হার ২৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা যায়, আমাদের দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা কর্মসংস্থান কোনোটিই নেই। কাজেই আসন্ন বাজেটে এ খাতের বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে দক্ষ জনবল সৃষ্টির জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতে বাজেটের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। রাজস্ব আয় বৃদ্ধির দিকে সরকারকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সর্বসাকুল্যে ৫ হাজার ৮৪৮ জন করদাতা অনলাইনে তাদের রিটার্ন জমা দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে টিআইএনধারীর সংখ্যা ৫০ লাখ ৭২ হাজার। গত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত কর জমা দিয়েছেন ১৫ লাখের কিছু বেশি করদাতা। বাকি করদাতার বিরুদ্ধে সরকার কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে—তা আমাদের জানা নেই। দেশে করযোগ্য আয়ের যদি অর্ধেক করদাতা তাদের রিটার্ন জমা দিতেন, তাহলে আমাদের অর্থনীতির চিত্রটা বহু গুণে পালটে যেত। দেশের উন্নয়নে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। এই রাজস্ব আয় বৃদ্ধির ব্যাপারে ইতিপূর্বে বেশ কিছু পরামর্শসহ পত্রিকায় লিখেছিলাম কিন্তু তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। দেশে রাজস্ব আয় সংগ্রহের একমাত্র প্রতিষ্ঠান এনবিআরের একার পক্ষে স্বল্প জনবল এবং স্বল্প লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে সারা দেশের রাজস্ব আয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বেসরকারি খাতের সহযোগিতা একান্তভাবে প্রয়োজন। বিদ্যুত্ উত্পাদনে সরকারের আজকের এ সাফল্য সম্ভব হয়েছে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। ঠিক একইভাবে যদি রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য সরকার বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এগিয়ে আসে, তাহলে আর সরকারকে ব্যাংক ঋণ বা অন্য কোনো আয়ের ওপর নির্ভর করতে হবে না—এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় দেড় কোটি প্রবীণ। এই প্রবীণ জনগোষ্ঠী তাদের শেষ জীবনের সঞ্চয় ব্যাংকে রাখে বা সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে বাকি জীবনটা কাটায়। অবশ্য যারা সত্ভাবে জীবন নির্বাহ করে। এটাই অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণদের আর্থিক সক্ষমতার উত্স। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এই প্রবীণদের সঞ্চয়ের মুনাফা গত অর্থবছর থেকে ৫ শতাংশ হারে কেটে রাখা হচ্ছে, যা অত্যন্ত অমানবিক। এ ছাড়াও মাত্র ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র কেনার বিধান রয়েছে। কিন্তু ৫০ লাখ টাকার মুনাফা কত আসে এবং এই দুর্মূল্যের বাজারে এই অর্থ দিয়ে একটি সংসার চালানো সম্ভব কি না, তা কি কেউ ভেবে দেখেছেন? এ নিয়ে বহু আবেদন-নিবেদন করেও কোনো লাভ হয়নি। এই দেশ, সমাজ ও পরিবারের জন্য যারা তাদের তারুণ্যকে বিকিয়ে দিয়েছেন, অমানুষিক শ্রম দিয়েছেন—সে খবর রাখার কোনো প্রয়োজন কেউ মনে করছেন না। প্রবীণরা সমাজে অপাঙেক্তয়। সিনিয়র সিটিজেনদের কথা ভাবার সময় তাদের নেই। সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে তাদের যে মর্যাদা পাওয়ার কথা, তা তারা পাচ্ছেন না। মুখে বা কাগজে-কলমে বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকলেও আমাদের দেশে সেটা নেই বললেই চলে। কাজেই ব্যাংক, বিমা, হাসপাতাল, ট্রেন, বাস, অফিস-আদালতসহ সমাজের সর্বক্ষেত্রে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য আলাদা কাউন্টারের সুযোগ-সুবিধাসহ অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধির জন্য বর্তমান প্রবীণবান্ধব সরকারের কাছে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে আবেদন জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে ব্যাংক ও সঞ্চয় ব্যুরোর অফিসগুলো সিনিয়র সিটিজেনদের বসার ব্যবস্থা, টয়লেট সুবিধাসহ আনুষঙ্গিক সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাচ্ছি। কারণ, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা তুলতে গিয়ে তারা যে হয়রানি এবং অপমানের সম্মুখীন হন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় কোভিড-১৯-এর কারণে মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যবিমোচন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। বিশ্বব্যাপী অন্তত ১০ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসতে পারে। এসব বিষয় মাথায় রেখেই আসছে বাজেটে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং সেভাবেই বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। কারণ, আমাদের মনে রাখতে হবে, আর্থিক দিকের সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীতে এসে এটাই আমাদের বড় অর্জন।
n লেখক :অর্থনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক,
সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক
