বিচার চাই, প্রতিশোধ নয়

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:৫৩

খুব পুরোনোকালের কথা নয়। ১৯৩৮-৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেই বিনা উসকানিতে জার্মানি প্রতিবেশী অস্ট্রিয়া, পোল্যাল্ড, চেকোস্লোভাকিয়া, নেদারল্যান্ডসের মতো স্বাধীন দেশগুলোকে একে একে দখল করে নেয়। শুধু দখল করেই ক্ষান্ত হয়নি, যে বীভত্স নিষ্ঠুরতা চালিয়েছে তা কল্পনায় আনতেও কষ্ট হয়। পোল্যান্ড চেকোস্লোভাকিয়ায় ঢুকেই বিনা অজুহাতে হাতের কাছে যাকে পাওয়া যায় তাকে হত্যা করতে থাকে। আর ইহুদি নিধন ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের কাহিনি তো সবার জানা। এই যুদ্ধে জার্মানি পরাজিত হওয়ার পর যে ন্যুরেনবার্গ ট্রায়াল গঠিত হয় তার প্রধান নীতি ছিল justice instead of revenge. অর্থাত্ প্রতিশোধ নয়, বিচার সুনিশ্চিত করা। আর সেই মূল্যবোধের কারণেই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিচারের কাজ বিচারের মতোই চলল; কিন্তু পিপল টু পিপল, গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে সুদৃশ্য, সমৃদ্ধ ইউরোপ গড়ে তোলার মহোত্সব শুরু হলো। জার্মানি এখন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশ। পার্ল হারবারে বোমা ফেলার মধ্য দিয়ে জাপান ও আমেরিকা যে যুদ্ধ শুরু করেছিল তা হিরোশিমা নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের শেষ হয়েছিল। সেই আমেরিকা আর জাপান এখন হরিহর আত্মা। গ্রেট ব্রিটেন, জার্মানি, পোল্যান্ড চেক রিপাবলিক, নেদারল্যান্ডস সেই ভয়াবহ যুদ্ধের ইতিহাস যত্নের সঙ্গে রক্ষা করছে, স্মৃতিচিহ্নগুলো ধুয়ে মুছে রাখছে; কিন্তু কোনো দেশের বর্তমান রাজনীতিতে তার কোনো প্রতিফলন নেই। কেউ কাউকে বলে না, ‘মনে নাই যুদ্ধের সময় কী করছিল!’

কিন্তু কিছু দেশ আছে যারা বিচার ও প্রতিশোধের পার্থক্য বোঝে না বরং বিচার গৌণ হয়ে প্রতিশোধ মুখ্য হয়ে উঠতে দেখা যায়। ফলে পুরোনো কাদায় এসব দেশ গড়াগড়ি করতে থাকে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা এই দ্বিতীয় শ্রেণির বিশ্বে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছি। সার্বিক অবস্থা দেখে মনে হয়, এখানে বিচারটা নয়, প্রতিশোধ তীব্র হয়ে উঠছে। যার প্রভাব গিয়ে পড়ে রাজনীতিতে, প্রশাসনে এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে। আমাদের দেশে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায়। একদিকে রাজাকার আলবদর গালিও আছে, জেলা-উপজেলা—সর্বত্র মাইক হাতে নিয়েই যাকে ইচ্ছা, যাকে প্রয়োজন তাকে রাজাকার আলবদর বলে গালি দেওয়া চলছে, আবার অন্যদিকে অসংখ্য মানুষ হয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী যাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ছিল বিতর্কিত ভূমিকা। শুদ্ধতার দাবিদার এক ধরনের রাজনীতিক আবার নতুন করে দলে ভেড়াকে নাম দিচ্ছে অনুপ্রবেশকারী। প্রশ্ন হলো—আপনি কাকে অনুপ্রবেশকারী বলছেন? যদি অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধই হয় তাহলে আপনারই চোখের সামনে আপনার দলে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি অনুপ্রবেশ করছে কীভাবে, পদ-পদবী বাগিয়ে নিচ্ছে কীভাবে?

এই ভেজালের মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঢুকে পড়ছে প্রশাসনের ব্যক্তিরাও। রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে বিনিময় প্রথা। ফলে দেখা দিয়েছে মারাত্মক এক সংকট যার ভুক্তভোগী শেষ পর্যন্ত জনগণ। যে অনুপ্রবেশকারীদের কথা বলা হচ্ছে তারা আবার এতটাই প্রভাবশালী যে, চাকরিবিধির নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একজন কর্মকর্তাকে রাতারাতি বদলি করে দিচ্ছে। আবার আরেক প্রশাসনের কর্মকর্তা ‘বিশেষ বিনিময়ে’র দ্বারা ইচ্ছামতো কাউকে রাজাকার, কাউকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে দিতে দ্বিধা করছে না। দেশে একজন পিওন থেকে সচিব পর্যন্ত সবাই এই রাজনৈতিক জ্বরে আক্রান্ত। এদেশে রাজনৈতিক জাঁতাকলে পড়ে বারবার রাজাকার আলবদরের তালিকা হতে দেখেছি। তার মধ্যেও আমরা কত রকম অনিয়ম দেখতে পেয়েছি তা উল্লেখের আর প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। এ বিষয়ে যারা সত্য উচ্চারণ করতে গিয়েছে তাদের হেনস্তা হতেও দেখা যায়। এমনকি রাজাকার আলবদর চিহ্নিত করার যে নীতি বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করেছিলেন তাও আজ উপেক্ষিত হতে দেখছি শুধু রাজনৈতিক বিবেচনা মাথায় রেখে।

এ সবই হলো প্রয়োজনীয় কাজ রেখে প্রতিশোধপ্রবণতার বাই-প্রোডাক্ট। শুধু বাংলাদেশ নয়, যে কোনো দেশের উচিত বিদ্যমান সমস্যা, বর্তমান সমস্যা চিহ্নিত করা এবং তা নিয়ে কাজ করতে মনোযোগী হওয়া। এত সমস্যা বিশ্বব্যাপী বিদ্যমান—তা রেখে যখন পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটাঘাঁটি করা হয় তখন বুঝতে হয় বর্তমানের প্রতি মনোযোগে ঘাটতি রয়েছে। করোনা ভাইরাস সারা পৃথিবীকে নাস্তানাবুদ করে তুলেছে। যে অর্থনৈতিক ক্ষতি এরই মধ্যে সাধিত হয়েছে বিশ্বের প্রতিটি দেশে, সেই ক্ষত থেকে কবে নিস্তার মিলবে সে সম্পর্কে কারো কোনো পরিষ্কার ধারণা নেই। অর্থনীতিবিদরা শুধু হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ টালমাটাল অবস্থার মধ্যে পড়েছে। দেশটির ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকের মতে—প্যানডেমিকের কবলে পড়ে সেখানে ৫৭ লাখ মানুষ চাকরিহীন হয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে ২৭ লাখ আমেরিকান সরাসরি ছাঁটাইয়ের শিকার। বিবিসি গত ২৬ জানুয়ারি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য আগামী এপ্রিল থেকে জুন মাসের সময়ে বেকারত্বের হার ৭ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াবে। অর্থাত্ মোট ২৬ লাখ মানুষকে বেকারত্বের যন্ত্রণায় ভুগতে হবে। এই যখন ধনী দেশের অবস্থা তখন আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ কোথায় তা মাথায় আসে না। উন্নয়ন কমবেশি সব দেশেই হয় এবং হচ্ছে; কিন্তু সেই উন্নয়ন করতে গিয়ে বিপদের দিক থেকে নজর সরিয়ে রাখলে বিপদ আরো ভয়াবহ রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, অর্থসম্পদলোভীরা টিকে থাকতে পারেনি; কিন্তু এই অর্থসম্পদলোভীদের অর্থের উত্স কী—সেটা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা জরুরি। আমরা দেখে আসছি ক্ষমতায় যারা থাকেন, তাদের দলের লোকেরাই ক্ষতি করে থাকে। বাহিরের লোক ক্ষতি করতে পারে না। অতএব যে কোনো মূল্যে এদের ঠেকাতে হবে।

সম্রাট সিজার অগাস্টাস রোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি সেই সাম্র্রাজ্যকে বর্তমান ইংল্যান্ড থেকে মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিলেন। তিনি তার সাম্রাজ্যকে অবকাঠামোগত দিকে এক বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছিলেন। জীবনের অন্তিম সময়ে মৃত্যুশয্যায় শায়িত ৮০ বছর বয়সি সম্রাট বলেছিলেন, ‘I found Rome built of bricks and left her clothed in marble.  অর্থাত্ ইটের তৈরি রোম শহরকে মার্বেল পাথরে আচ্ছাদিত করে দিয়েছিলেন; কিন্তু ইতিহাসের নির্লিপ্ত বিচারে তাকে অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে এই কারণে যে, তিনি একটি রিপাবলিককে সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন। সুতরাং আমরা যে যেখানে যেই অবস্থানে আছি, সেই অবস্থান থেকে প্রতিটি মানুষের আত্মোপলব্ধি করা প্রয়োজন। ইতিহাসের নির্মম বিচারে যাতে তিরস্কৃত না হই সে ব্যাপারে সজাগ হওয়া প্রয়োজন এবং সেটা এখনই। এটাও মনে রাখা দরকার, যেসব দেশ কাউকে টুঁ শব্দ করতে দেয়নি তাদের সব দেশকেই খেসারত দিতে হয়েছে। মনে রাখা দরকার, আমরা যেন বিচার আর প্রতিশোধকে এক করে না ফেলি।

n লেখক : সাংবাদিক