তোমার ছলে আমি ভাসি আঁখিজলে

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:৫৬

এখন আমাদের যাপিত ও বর্তমান সময়-সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ব্যর্থতার মোড়কে ঢাকা দায়মুক্তির নির্লজ্জ একটি সাহসী  উচ্চারণ :‘ইহা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা!’ ব্যস, সবাই আবার ঠিক আগের মতো খাচ্ছে খেলছে ঘুরছে ফিরছে। কারোর তেমন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নেই। মিডিয়াগুলো অনন্য ভাবনায় হন্যে হয়ে কোনো এক কারণ-বারণ নিয়ে কিছু একটা খুঁজছে বলছে লিখছে আর লিখছে। একসময়ে সবাই সমঃস্বরে বলেন, ‘আসলে ইহা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, এখানে কাউকে দায়ী করা যাচ্ছে না! তবে ভবিষ্যতে সতর্ক হয়ে ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করবে।’

ব্যর্থতার দাবানলে পুড়ে ছারখার প্রতিদিন ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ।  আপনার আমার সঙ্গে চলা কথিত নিরীহ ঘরানা সত্ পরোপকারী ধার্মিক প্রাণীগুলো কলিগ, স্যার-বস, বড়ভাই-ছোটভাই, প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে মন প্রাণ ললাট-প্রলাপ, জবান হূদয় অক্টোপাসে বেঁধে বাংলার দুর্ভাগা শেষ রাজা লক্ষ্মণ সেন, শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা বানিয়ে শাসন-শোষণ, তোষণ-পেষণ করে চলেন।

অমাত্য ঘরানাকেন্দ্রিক চরম স্বার্থপর ভীষণ বিশ্বাসঘাতক এ প্রজাতির কাছে নীতিশাস্ত্রের জনক স্বয়ং চাণক্য পণ্ডিত পর্যন্ত নাকানিচুবানি খেয়ে নিজেই যুদ্ধ করে অধিকার সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। এ বহুরূপী-বহুমুখী  ভয়ংকর প্রজাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জেতা কিন্তু সহজ নয়! যারাই টের পেয়ে কিছু একটা করার চেষ্টা করেছে বা করছে! মুহূর্তে দিগম্বর হয়ে গাইতে হয়েছে—‘বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের মেলা।’

আগের দিনে মানুষের ভৌগোলিক কারণে জ্ঞান-গরিমা কিছুটা কম ছিল; চরম অভাবে স্বভাব নষ্ট করে এটা সেটার দোহাই দিয়ে লুটতরাজ ধর্ষণ ডাকাতি করে নতুন-নতুন  সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে। যারা করেছে, তারা পরে ভুল বুঝতে পেরে ‘খালি হাতে এসেছি ভবে, খালি হাতে যাচ্ছি চলে’ এমন আফসোস করে মহামতি আলেকজান্ডার পর্যন্ত নখদন্তহীন বাঘ হয়ে সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তাদের দুর্মর রাজন্য ইতিহাসবেত্তা ঔপন্যাসিকগণ পরে পরিস্থিতি সময় বুঝে ইতিহাসের খলনায়ক ডাকাত খুনি ধর্ষকের গুণবাচক বিশেষণে পায়ের নখ হতে শুরু করে মাথার চুলে এসে বন্দনা শেষ করেন এভাবে :‘আসলে ঐ সময়ে কাফের বেইমান সন্ত্রাস পুরুষ বেশ্যা, দুর্নীতিবাজ বেহায়াপনা দমনে ইহা ছিল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। পরে সবাই অনুকৃত করে রাস্তায়-রাস্তায় নৃত্য করেছে।’

সে চামচা ভীষণ ইতিহাসবেত্তা-ঔপন্যাসিকের হাত ধরে এখনো বিশ্বের অনেক দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের সামন্তপ্রভু হয়ে পরিবার সমাজের সব সামন্তপ্রভু এককাট্টা হয়ে সবখানে চামচামি করে বলতে শোনা যায়, ‘ইহা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, আমাদের চেষ্টা আন্তরিকতার কমতি নেই, অবহেলার প্রশ্নই ওঠে না। আরো বলেন : তদুপরি ও প্রথমবার অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’ ব্যস! সবার দায়িত্ব শেষ।  

বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠতা নিয়ে বিদ্যুত্ টেলিফোনে ভর করে সুপার কম্পিউটার হয়ে মহাকাশ, চিকিত্সাবিজ্ঞান, ইতিহাস, জেনেটিক্স সুবিধা নিয়ে ‘মানুষ’ নামের কথিত নিরীহ গোল আলু সবজিটি নতুন-নতুন আপেক্ষিক সুখ ভোগের সব ফর্মুলা রপ্ত করে যখন জানতে পেরেছে! সব সময়ে ডোপামিন-টেস্টোস্টেরন হরমোন চরম পুলক সুখে নিরাপদ থাকতে ঘেঁটে-ঘেঁটে কখনো ধর্ম, কখনো বর্ম পরে  ইতিহাস, সংস্কৃতি ধর্মযুদ্ধ, মল্লযুদ্ধ, প্রেম, প্রতারণা-ভণ্ডামি বিশ্বসেরা সব সার্চ ইঞ্জিন চালিয়ে ওয়েব-জগতের ন্যায়-অন্যায়ের স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ পড়ে দিন গুজরান করছে :‘তখনি হয়ে যাচ্ছে—নিরীহ গোলআলু ‘ডিজিটাল তস্কর ভয়ংকর।’

‘মানুষ’ নামের ডিজিটাল ভয়ংকর দ্বিপদী গোলআলু ঘরানা নিরীহ কিসিমের সবজিটি দেখে প্রথমে পৃথিবীর সব প্রাণী মনে করেছিল :‘আহা! কী সুন্দর এ নিরীহ প্রাণী! পশু আফসোস করে বলেছে, ‘আমাদের মতো মাথায় শিং নেই, চারটি পা নেই, কুলার মতো কান নেই, বিশাল দেহ নেই, আহা! কী নিরীহ শান্ত!’ কী সুন্দর করে এ প্রাণীটি নিয়ম করে স্রষ্টাবন্দনা সেরে নানা ব্যঞ্জন দিয়ে  নিয়ম করে চিবিয়ে চিবিয়ে খাবারের স্বাদ নেয়। আমাদের সেবা করে আহা! কী নিরীহ প্রাণী। পশু সমাজের এমন চিন্তাতে : মানুষ নামের গোলআলু দ্বিপদী সবজিটি আস্তে আস্তে ইকোসিস্টেমের দোহাই দিয়ে পশু-পাখি-মত্স্য সম্প্রদায়ের সোনাবন্ধু গান ধরে হালের হ্যামিলনের বাঁশি বাজিয়ে  একসময় নিজেকে রসনাবন্ধু করে সর্বভুক করে নেন।

দ্বিপদী গোলআলু সবজিটি প্রতিদিনের সোনাবন্ধু গানে পদ আহারে রসনাবন্ধু হয়ে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। দিনে দিনে ডিজিটাল তস্করবৃত্তি ভয়ংকর হয়ে আরো এক ধাপ এগিয়ে সবকিছুই শুদ্ধাচার সংস্কৃতি ষোলকলা পূর্ণ করে নিয়েছে।  

ধর্ম কর্ম বুদ্ধি ইকোসিস্টেম দোহাই দিয়ে সব প্রাণীর প্রাণ এখন ডিজিটাল ক্লোন সংস্কৃতিতে বস্তাবন্দি। জীবন বাঁচানোর তাগিদে ‘মানু্ষ’ নামের দ্বিপদ সবজিটি প্রথমে দিগম্বর হলেও সব প্রাণীর নিরীহ বিশেষণ সহানুভূতি বেলুনে চেপে আস্তে-আস্তে ডিজিটাল শুদ্ধাচার শিকড় ইকোসিস্টেম করে ভাগিয়ে নিয়েছে সবকিছু। পুষ্টি টেস্টোস্টেরন ভোগ সংস্কৃতি এখন বর্তমান আগামী দিনের স্বপ্ন। নেই কোনো ধর্মাধর্ম বিচার। এ প্রাণীর নেই ন্যূনতম কৃতজ্ঞতাবোধ ও সৌজন্যবোধ! সংস্কৃতি নিয়ে সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ জীবের উপাধি ধরে রেখেছেন। 

ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে—সহজ-সরল প্রাণীটি নিয়ে হাজারো গবেষণা  কোনো ইতিবাচক সফলতা বয়ে আনতে পারেনি। পশুমানব-নিচ-ছুঁচো ছোটলোক বিশেষণ ধারণেও নেই এ প্রজাতির কোনো আপত্তি! ছলনা প্রতারণা-ভণ্ডামি নিয়ে ধারাবাহিক পথচলা। চোখের পলকে হাসির ঝলক দিয়ে ছল-বল-কৌশলে এ প্রজাতি কখন কোথায় কীভাবে মুহূর্তে সর্বস্বান্ত করে সরব নীরবে ‘ইহা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ দোহাই দিয়ে আমাদের উচ্ছিন্ন-উচ্ছিষ্ট করে প্রতিদিনের আঁখিজলে ভাসিয়ে দেন : তা ভুক্তভোগীরাই ভালো জানেন।

n লেখক :প্রাবন্ধিক ও কবি, পুলিশ পরিদর্শক