দীর্ঘ তিন বছরের বেশি সময় পর যমুনা অয়েল কোম্পানির প্রায় কোটি টাকার তেল চুরির ঘটনায় অভিযুক্তরা চাকরি ফরে পাচ্ছেন বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে কোম্পানির তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে চুরিকৃত তেলের মূল্য ফেরতের ভিত্তিতে তাদের চাকুরিতে পুনর্বহাল করা হচ্ছে।
২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর যমুনা অয়েলের গুপ্তখাল ডিপো থেকে এমটি রায়দা ও এমটি মনোয়ারা নামের দুই জাহাজে তেল পাচারের অভিযোগ ওঠে। পরে ৫ নভেম্বর খুলনার খালিশপুর এলাকায় ভৈরব নদীতে অভিযান চালিয়ে চুরি যাওয়া তেল বিক্রির সময় এমটি রাইদা নামের ট্যাংকারটি আটক করে র্যাব-৬। এ সময় ট্যাংকারের থাকা ১৪ জনকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ৭ নভেম্বর খুলনার দীঘলিয়া থানায় মামলা করে র্যাব-৬। ঐ মামলায় এজিএম (টার্মিনাল) নুরুদ্দীন আহমেদ আল মাসুদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (অপারেশন্স) প্রিয়তোষ নন্দীকেও আসামি করা হয়। পরের দিন ২০১৭ সালের ৮ নভেম্বর ঐ সময়ের নুরুদ্দীন আহমেদ আল মাসুদসহ তিন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়।
তেল চুরির ঘটনায় প্রাথমিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ৯ জানুয়ারি পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। বিভাগীয় মামলায় এজিএম (টার্মিনাল) নুরুদ্দীন আহমেদ আল মাসুদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (অপারেশন্স) প্রিয়তোষ নন্দী, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (অপারেশন্স) আবদুর রাজ্জাক, সিনিয়র অফিসার (অপারেশন্স) সমীর কুমার পাল ও গোলাম কিবরিয়াকে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরে অভিযোগ পত্রের জবাব কর্তৃপক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ডিজিএম (এমআইএস অ্যান্ড আইটি) মাসুদ করিমকে আহ্বায়ক করে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ঐ কমিটিতে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ডিজিএম (এইচ আর) টিপু সুলতানকে সদস্য এবং যমুনা অয়েলের ম্যানেজার (বোর্ড ও কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) মোহাম্মদ ইসহাককে সদস্যসচিব করা হয়। বিভাগীয় তদন্ত কমিটি ঐ ঘটনায় বিভাগীয় মামলাধীন পাঁচ কর্মকর্তার মধ্যে চার জনের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেলেও ঐ ঘটনায় গোলাম কিবরিয়ার সম্পৃক্ততা মেলেনি। পাশাপাশি সাবেক ম্যানেজার (অপারেশন্স) জাহেদ মুরাদ ও সিনিয়র অফিসার (অপারেশন্স) নুরুল আলমের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি। প্রায় পাঁচ মাস তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ৩ জুলাই যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেন। বিভাগীয় তদন্ত কমিটি পরিদর্শনে গিয়ে এমটি রায়দা জাহাজ লোডের আলাদা দুটি পিটিও (প্রোডাক্ট ট্রান্সফার অর্ডার) নম্বর-১৪১০১৭১০০০৯৫ এর স্থলে ১৪১০১৭১০০০৯৭ উপস্থাপনেরও প্রমাণ পান। অথচ একটি চালানে একটি পিটিও থাকার কথা। অভিযোগ রয়েছে, খুলনায় দিগলীয়া থানায় র্যাবের দায়ের হওয়া মামলা থেকে রক্ষা পেতে পিটিএ ১৪১০১৭১০০০৯৫-এর স্থলে যোগসাজশের মাধ্যমে পিটিএ ১৪১০১৭১০০০৯৭ তৈরি করে অভিযুক্তরা।
পরে বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর আর্থিক ক্ষতির দায়দায়িত্ব নিরূপণ ও হার নির্ধারণের জন্য কমিটি গঠন করেন যমুনা অয়েল কোম্পানির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক গিয়াস উদ্দিন আনচারী। বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে দোষীদের বিরুদ্ধে চাকরি বিধি মোতাবেক পেনালটি, পানিশমেন্ট প্রদানের জন্যও আর্থিক ক্ষতির দায়দায়িত্ব নিরূপণ ও হার নির্ধারণ কমিটি-২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বরাবরে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেয়। ঐ প্রতিবেদন অনুযায়ী গায়েব হওয়া ১ লাখ ৫১ হাজার ৮৯০ লিটার ডিজেলের মূল্য ৯৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৪৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ঐ টাকা সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এজিএম (টার্মিনাল) নুরুদ্দীন আহমেদ আল মাসুদসহ পাঁচ কর্মকর্তার কাছ থেকে আদায়ের বিষয়ে মতামত দেন কমিটির সদস্যরা। এতে মোট ক্ষতির সাড়ে ৩২ শতাংশ হিসেবে নুরুদ্দীন আহমেদ আল মাসুদ ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (অপারেশন্স) আবদুর রাজ্জাকের কাছ থেকে ৩০ লাখ ৮৫ হাজার ৭৫৯ টাকা করে, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (অপারেশন্স) প্রিয়তোষ নন্দী হতে ২০ শতাংশ হিসেবে ১৮ লাখ ৯৮ হাজার ৯২৯ টাকা, সিনিয়র অফিসার (অপারেশন্স) সমীর কুমার পাল থেকে ১০ শতাংশ হিসেবে ৯ লাখ ৪৯ হাজার ৪৬৪ টাকা এবং সিনিয়র অফিসার (অপারেশন্স) নুরুল আলমের কাছ হতে ৫ শতাংশ হিসেবে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৭৩২ টাকা আদায়ের প্রস্তাব করা হয়।
যমুনা অয়েল কোম্পানির সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যমুনা অয়েলে চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ আদায়ের মাধ্যমেও চাকুরিতে পুনর্বহাল করা যেতে পারে। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তার ক্ষমতা বলে তা করতে পারেন। উল্লেখ্য, যমুনা অয়েল কোম্পানির ইতিপূর্বেকার বোর্ড সভায় ব্যবস্থাপনা পরিচালককে তদন্ত রিপোর্টের আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় বলে জানা যায়।
