ঋণখেলাপি হওয়ার নেপথ্যে

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:৩৮

ব্যাংকিং খাতে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বাইরেও বড় একটা অংশ বাস্তবতার শিকার। ঐসব বাস্তব সমস্যা সমাধান না হওয়ায় মূলত ঋণখেলাপি বাড়ছে। প্রক্রিয়াগত কারণেই অনেক শিল্পোদ্যোক্তা খেলাপি হয়ে যাচ্ছেন। মূলত, খেলাপি হওয়ার নেপথ্য কারণগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সৃষ্ট। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বড় ধরনের নীতি সংস্কারের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

করোনার কারণে এমনিতেই ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটা স্থবির হয়ে গেছে। এর ওপরে গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যার কারণে উত্পাদন ক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। ফলে কারখানা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। আবার ক্রেতাদের হাতে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে চাহিদা কমার কারণে রপ্তানি বাণিজ্যও কমেছে। এসব কারণে শিল্পোদ্যোক্তারা বিপাকে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়াও ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং সঠিক উদ্যোক্তাকে না দিয়ে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়ার কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।

ঢাকা ও আশপাশের এলাকার শিল্পকারখানার মালিকরা জানিয়েছেন, গ্যাস-বিদ্যুত্ সমস্যার কারণে উত্পাদন ব্যাপকহারে বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া কারখানায় কাঁচামাল নিয়ে আসার সময় ও উত্পাদিত পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা, বিভিন্ন স্থানে কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে হয়রানি তো আছেই। এতে দেশি বাজারের জন্য উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোও বিপাকে রয়েছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, আমাদের দেশে ব্যাবসায়িক নীতির (পলিসি) কারণেও ব্যবসা নষ্ট হচ্ছে। একদিকে উচ্চহারে কর অন্যদিকে নীতিগত দিক থেকে সমস্যা। এখানে নীতির ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে না। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নীতিমালার শিথিলতা, গোষ্ঠীবিশেষের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। এতে বাজারে সমতা থাকে না। এছাড়া ব্যাংকগুলোও প্রকৃত উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে সহযোগিতার মনোভাব পোষণ করে না। ব্যাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বারবার ‘ব্যাংক-গ্রাহক’ সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে যে কোনো সমস্যার সমাধান করতে বললেও তা হচ্ছে না। সূত্র জানায়, ইচ্ছেকৃত খেলাপিদের প্রভাব এত বেশি যে তারা সরকারের উচ্চ মহল থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতির ওপর হস্তক্ষেপ করছে। তাদের সুবিধামতো নীতি তৈরি করছে। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ব্যবসা পরিচালনা করে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে নাভিশ্বাস উঠছে তাদের। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে, ব্যবসা বন্ধ করে পালানোর অবস্থা। আবার কেউবা দেউলিয়াত্বের পথে।

সর্বশেষ তথ্যমতে, বিশেষ সুবিধা এবং ছাড় দেওয়ার ফলে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমে এসেছে। তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা কমে ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাস শেষে এটা ছিল ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

চলতি বছরের মার্চ থেকে দেশে শুরু হয় মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রকোপ। এর প্রভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেরও নানা খাতে সংকট তৈরি হয়। এই সংকটকালে ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা দেয় সরকার। এ সুবিধার ফলে ডিসেম্বর পর্যন্ত কিস্তি না দিলেও খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়নি তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা পরিস্থিতির বেশ উত্তরণ হলেও এখনো স্বাভাবিক হয়নি ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি। এমন পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা নতুন করে বিনিয়োগে নামছেন না। এমন প্রতিকূল অবস্থায় টিকে থাকতে না পেরে শিল্পকারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। এতে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ বাড়ছে না। অন্যদিকে আগে দেওয়া ঋণের অর্থ গত বছর ফেরত পায়নি বললেই চলে। এতে চলতি বছরে বেড়ে যাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ছোট-বড় সব ঋণেই এমন অবস্থা তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসমূহ এখনো কোভিড-১৯-এর ভয়াবহ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আর সংক্রমণও একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তাদের ক্যাপাসিটির অর্ধেক উত্পাদন করছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারের অবস্থা খারাপ হওয়ায় গার্মেন্টস কোম্পানিগুলোর ওয়ার্কঅর্ডার ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে দৈনন্দিন ব্যাবসায়িক খরচ মিটিয়ে মুনাফা পর্যায়ে যাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। বিদ্যমান ঋণখেলাপি হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।