অনেক হইয়াছে, নাকের ডগা অবধি ডুবিয়া গিয়াছে

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:৩৩

একটি অন্যায়কে যখন প্রশ্রয় দেওয়া হয় কিংবা অন্যায়টিকে যখন আড়াল করা হয়, তখন সেই অন্যায় বা অপরাধের নিকৃষ্ট দিকটি ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়া উঠিতে থাকে। ফেনীতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক প্রকৌশলীকে ঠিকাদারের মারধরের ঘটনাটি সেই ধরনেরই একটি অপরাধ। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা গিয়াছে, ফেনী সদর উপজেলার ভূমি অফিসে টিউবওয়েল স্থাপনের কাজটি যেই ঠিকাদার পাইয়াছেন, তাহা নিম্নমানের হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার রাতে সরেজমিনে তদন্তে গিয়াছিলেন সংশ্লিষ্ট কাজের একজন উপসহকারী প্রকৌশলী। ঠিকাদারকে যখন ঐ প্রকৌশলী সঠিকভাবে কাজ করিবার কথা বলেন তখন অকথ্য ভাষায় গালাগালি করিয়া প্রকৌশলীকে মারধর করিবার অভিযোগ উঠে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় ফেনী মডেল থানায় চার জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হইয়াছে।

ইতিমধ্যে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা যেইভাবে এই ধরনের কাজ চালাইয়া যাইতেছেন, তাহাতে বুঝা যায়, কাজ যতটুকু হইবার কথা তাহার অর্ধেকও হয় নাই। বহু ক্ষেত্রে কাজ অসম্পূর্ণ রাখিয়া কাজের বিল উঠাইয়া লইবারও অসংখ্য ঘটনা ঘটিয়াছে। বিভিন্ন কাজের সহিত যুক্ত ঠিকাদার, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনেক ক্ষেত্রেই যোগসাজশ করিয়া যাহা করেন তাহা সকলেই জানেন। বলা যায়, যেইভাবে তাহারা কাজ করেন, তাহা হামেশাই পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হইয়া থাকে। এবং সরকারও অনেক সময় সতর্ক করিয়া দিয়া থাকে। কিন্তু তাহাতে অধিকাংশ সময় খুব অধিক কাজ হয় না। ইহা নূতন নহে। এই ধরনের অনিয়ম-অরাজকতা সকল সরকারের আমলেই হইয়া আসিতেছে; কিন্তু তাহার পরও অনিয়মের কথা বলিয়া সরকারি কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীদের গায়ে হাত দেওয়াটা কিছুতেই বরদাস্ত করা যায় না। আমরা দেখিতে পাইতেছি, এই ধরনের ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রীতিমতো বিব্রত অবস্থা বিরাজ করিতেছে প্রশাসনের মধ্যে। ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময় আমরা এমন কিছু ভিডিও দেখিয়াছি, যেইখানে উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনকেও হুমকি-ধমকিসমেত অশ্রাব্য গালিগালাজ করা হইয়াছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যেন এই সকল অরাজকতা, অসহিষ্ণুতা ও ঔদ্ধত্য মোকাবিলা করিবার কেহ নাই। খাল খনন হউক আর চাকুরিতে নিয়োগ হউক কিংবা বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজের বিষয়ই হউক—ক্ষমতাধরদের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের দাপটে স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম চালাইয়া যাওয়াটাই কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। এমতাবস্থায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে জমিয়া উঠা ক্ষোভের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রকাশ ঘটিলে তাহাকে অস্বাভাবিক বলা যাইবে না। আমরা অনেক দিন ধরিয়াই দেখিতে পাইতেছি যে, অমুকের কথা না শুনিলে বদলি, তমুকের কথা না শুনিলে চাকুরি হারাইবার মতো হুমকি-ধমকিও চলিতেছে নিরন্তর। ফলে প্রশাসন কী করিবে—অনেক ক্ষেত্রেই তাহার দিশা পায় না।

সুতরাং, ইহা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলাই যায় যে, নিয়ম অনুযায়ী কার্যকর্ম সম্পাদন করিতে সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি এইভাবে প্রায়শই বিব্রত বা অসহায় বোধ করেন কিংবা মারধরের শিকার হন—তবে তাহা অত্যন্ত দুঃখজনক, বিপজ্জনক ও লজ্জাজনক। এইভাবে চলিতে পারে না। আমরা মনে করি, এমন অপরাধ করিয়া অপরাধীরা পার পাইয়া গেলে এবং ইহার যথাযথ বিচার না হইলে প্রশাসনে ভাঙিয়া পড়িবে। কারণ, বহুকাল ধরিয়া এই ধরনের অপরাধের ক্লেদ জমিয়া জমিয়া এখন প্রশাসনের নাকের ডগা অবধি ডুবাইয়া দিয়াছে। এই ক্লেদের অশনিসংকেতের মর্ম বুঝিতে হইবে। এই জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আমরা এই ধরনের অপরাধীর জন্য আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ দণ্ডের সুপারিশ করিতেছি।