প্রভিশন ঘাটতিতে দুর্বল হচ্ছে ব্যাংকের ভিত্তি

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২৩:১৭

মহামারিতে বিশেষ সুবিধা এবং নানা ছাড়ের ফলে কাগজে-কলমে কমেছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। সাধারণত, খেলাপি ঋণ কমলে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখার চাপও কমে যায়। তবে এ সুবিধা পাওয়ার পরও দেশে কর্মরত ১১টি ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে পারেনি। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। করোনার কারণে খেলাপি ঋণ কমলেও প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হওয়া ব্যাংকের সংখ্যা কমেনি। প্রভিশন ঘাটতি হওয়ার মানে ব্যাংকের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া। একই সঙ্গে এতে আমানতকারীদের অর্থও অনিরাপদ হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, যেসব ব্যাংক প্রভিশন রাখতে পারেনি সেগুলো হলো রাষ্ট্রীয় মালিকানার বেসিক ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংক। বেসরকারি খাতের ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট্র ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। এদিকে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকেরও প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে।

ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভিশন ঘাটতি বেসিক ব্যাংকের। এ ব্যাংকের ঘাটতি ৩ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। এর অগ্রণীর ১ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংকের প্রায় ৮২২ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। এর বাইরে বেসরকারি খাতের ছয় ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৫০৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা, ঢাকা ব্যাংকের ১৯০ কোটি ৮৭ লাখ, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ২১০ কোটি ৬৬ লাখ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪৩৫ কোটি ৩৮ লাখ, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৩ কোটি এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১৩২ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এছাড়া বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ১৬৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ৭৮ লাখ টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গেল ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে সার্বিক প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৬৪ হাজার ৮০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৬৪ হাজার ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ফলে সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে মোট নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি দাঁড়ায় ১২৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। কয়েকটি ব্যাংক প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত (উদ্বৃত্ত) অর্থ নিরাপত্তা সঞ্চিতি হিসাবে রাখায় সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে ঘাটতির পরিমাণ কিছুটা কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

জানা গেছে, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করে তার বেশির ভাগই আমানতকারীদের অর্থ। আমানতকারীদের অর্থ যেন কোনো প্রকার ঝুঁকিতে না পড়ে সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে। এর একটি হলো প্রভিশন সংরক্ষণ। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের অশ্রেণিকৃত বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে পাঁচ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হয়। নিম্নমান বা সাব স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে রাখতে হয় ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কুঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে এ প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়। খেলাপি ঋণ বাড়লে, আর সে অনুযায়ী ব্যাংকের আয় না হলে প্রভিশন ঘাটতি দেখা দেয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, প্রভিশন ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না।

করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে ঋণগ্রহীতা ঋণের কিস্তি শোধ না করলেও তাকে খেলাপির তালিকায় দেখানো যাবে না, ২০২০ সালের প্রায় পুরোটাই গ্রাহকরা এ সুবিধা পেয়েছেন। এর বাইরে খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিল, পুনর্গঠনে বিভিন্ন নীতিমালার শর্তে শিথিলতা আনা হয়েছে। এতে করে গত এক বছরে ঋণের কিস্তি না দিয়েও নতুন করে কোনো ঋণখেলাপি হয়নি। এসব কারণে খেলাপি ঋণ কমেছে। ফলে সার্বিক প্রভিশন ঘাটতিও কমে গেছে। তবে ঋণ গ্রহীতাদের বিশেষ সুবিধার পরও যেসব ব্যাংক খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আর মূলধন ঘাটতি মানে তা ব্যাংকিং খাতের জন্য নেতিবাচক।