বছর ঘুরে আবার এসেছে ফেব্রুয়ারি। শুরু হয়েছে ভাষার মাস। ১৯৫২ সালের এই মাসে বাংলার
দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছিল। পরবর্তীকালে বায়ান্নর সেই সূত্র ধরে আসে উনসত্তরের
গণ-অভ্যুত্থান। আসে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এলো স্বাধীন বাংলাদেশ। চেতনা, গৌরব ও আত্মত্যাগের এই মাসে বাংলা ভাষাকে নিয়ে প্রত্যাশা ও অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের
কয়েক জন শিক্ষার্থী। তুলে ধরেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক— মুতাছিম বিল্লাহ রিয়াদ
সুষ্ঠু বাংলা ভাষার চর্চা হোক
—মেহেদী হাসান সবুজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ভাষা দিবস আগত। বছরের একটি দিন (শুধু ২১ ফেব্রুয়ারি) বাংলা ভাষার স্মৃতিচারণ বা টাইমলাইন ভর্তি স্ট্যাটাস দিলেই ভাষার যথাযথ মর্যাদা রক্ষিত হয় না। এজন্য দরকার হয় ভাষার প্রতি গভীর চেতনাবোধ ও দেশপ্রেম। তথাকথিত ফেসবুকীয় ভাষা বর্জন করে, চর্চা হোক সুষ্ঠু বাংলা ভাষার। ভাষার সার্বিক মর্যাদা ও সুষ্ঠু ব্যবহার ও চর্চা নিশ্চিত হোক সর্বত্র।
রাষ্ট্রের সর্বত্র বাংলার ব্যবহার হোক
—মো. শফিউল্লাহ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে বুকের তাজা রক্ত দিয়েছেন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ নাম না-জানা আরো অনেকেই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ভাষা আন্দোলনের ৬৯ বছর এবং স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হতে চললেও রাষ্ট্রের সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি। বাংলা ভাষাকে কার্যকর ভাষা হিসেবে নিশ্চিত করতে দরকার বাংলা ভাষার দাপ্তরিক, আইনি এবং শিক্ষায় ব্যবহার। এই তিনটি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি ঘটবে। বঙ্গবন্ধু নয়া চীন সফরে গিয়ে শান্তি কমিটির সভায় এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়েছেন। তবে আমরা কেন বাংলা ভাষায় কথা বলতে এত দ্বিধা করি? আসুন আমরাও বাংলা ভাষাতে কথা বলি, বাংলা ভাষাকে ভালোবাসি এবং বাংলাদেশকে ভালোবাসি।
মাতৃভাষায় হোক শিক্ষাদান
—সাদিয়া সাবাহ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলা ভাষা সৌন্দর্য আর নান্দনিকতায় সেরা। ১৯৫২ সালে এ ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন রফিক, সালাম, জব্বার, শফিউর। কিন্তু আজ সে মাতৃভাষার বেহাল দশা। বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত হলেও আমাদের নিজেদের দেশে তা অবহেলিত। আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এখনো ইংরেজির দখলে। আর তরুণ সমাজকে তো বিদেশি সংস্কৃতির ভূতে ধরেছে। অপসংস্কৃতির কবলে বাংলা ভাষা আজ ম্রিয়মাণ। ইংরেজির সঙ্গে বাংলা মিশিয়ে বলাটাই যেন আজকাল প্রশংসার দাবিদার হয়ে উঠেছে। প্রমথ চৌধুরী যেন ঠিকই বলেছিলেন, ব্যাধিই সংক্রমক, স্বাস্থ্য নয়। বাংলা ভাষাকে যদি আমরা সঠিক মর্যাদা দান করতে চাই তাহলে প্রথমত আমাদের উচ্চতর শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত করতে হবে। মাতৃভাষায় শিক্ষাদান ছাড়া কোনো জাতিই উন্নতির শিখরে উঠতে পারে না।
মাতৃভাষাকে অবহেলা না করি
—জাহিদ হাসান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
জন্মের পর থেকে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি দিয়ে মায়ের কোল থেকে শিখেছি প্রিয় মাতৃভাষা। তবে আধুনিক থেকে অতি আধুনিক হতে যেয়ে আজ ভুলে যাচ্ছি মাতৃভাষাকে। বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি বিদেশি সংস্কৃতি ও ভাষাক। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে চাপা রেখে বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেদের শিকড়কে অবহেলা করছি। তাই এই ভাষার মাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাই আমাদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখি। মায়ের দেখাশোনা করার দায়িত্বটা যেমন আমাদের তেমনি মায়ের ভাষাটাকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্বটাও আমাদের।
আঞ্চলিক ভাষায় হীনম্মন্যতা নয়
—রেজওয়ান আহমেদ সাজ্জাদ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলা ভাষার একটা বড় বৈশিষ্ট্যই হলো বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন রকম আঞ্চলিক ভাষার প্রচলন। যাদের রয়েছে নিজস্ব শব্দকোষ ও রীতি। যা বাংলা ভাষাকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শব্দ দিয়ে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করছে। শুধু কথায় নয়, প্রাচীন যুগ থেকে আঞ্চলিক ভাষা কবিতা, গান, সাহিত্য বা নাটকের সংলাপে ব্যবহূত হয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমানে দেখা যায়, অনেকেই আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ তো করেনই না বরং হীনম্মন্যতায় ভোগেন। আমাদের মনে রাখা উচিত, আঞ্চলিকতা মানে সংকীর্ণতা বা অনাধুনিকতা নয়, এটা আমাদের ঐতিহ্য। তাই ভাষার এই বৈচিত্র্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের ব্যক্তি, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ ভাষার বিকাশ রুদ্ধ হয়ে গেলে আমাদের সংস্কৃতির বিকাশও পথ হারাতে বাধ্য।
ভাষার বিকৃতি না করি
—ইকবাল হাসান, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
ভাষা আমাদের মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম একটি মাধ্যম। আমাদের সবার উচিত আমাদের নিজের ভাষা বাংলায় সঠিকভাবে কথা বলা। কিন্তু বর্তমানে হরহামেশাই দেখা যাচ্ছে ভাষার বিকৃতি। অনেকটা প্রতিযোগিতার মতো হয়ে গিয়েছে; কে কতটা বিকৃতভাবে একটি শব্দ উচ্চারণ করতে পারবে। আমাদের তরুণ প্রজন্মের উচিত মাতৃভাষার সুষ্ঠু ব্যবহার সম্পর্কে জানা ও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। বিকৃতিভাবে উচ্চারণ না করে বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারে সঠিকভাবে উচ্চারণ করে তুলে ধরতে হবে।
