বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, গোলাগুলি, বোমা বিস্ফোরণ, ভোট বর্জন, ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা, এজেন্ট বের করে দেওয়া, ইভিএম নষ্টে ভোট বন্ধ, বিএনপি, স্বতন্ত্র ও জাতীয় পার্টি-জাপা প্রার্থীর ভোট বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে দেশের চতুর্থ ধাপের ৫৫টি পৌরসভার ভোটগ্রহণ। গতকাল সকাল ৮টা থেকে এসব পৌরসভায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়, একটানা বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে। প্রথম তিন ধাপের ভোটে গোলযোগ-সংঘর্ষ হওয়ায় এবার বাড়তি সতর্কতা নেওয়ার কথা জানায় নির্বাচন কমিশন। তাতেও এ ধাপে সংঘাত ও সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়নি। বিএনপি-সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা বিভিন্ন পৌরসভা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণাও দেন। কাউন্সিলর প্রার্থীরাও থেমে থাকেননি। বিভিন্ন জায়গায় হানাহানিতে লিপ্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে পটিয়ায় অন্তত এক জন নিহত হয়েছেন। এই ধাপে ৫৫ পৌরসভার মধ্যে ২৯টিতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এবং বাকি ২৬ পৌরসভায় ব্যালট পেপারে ভোট হয়।
মেয়র পদে লড়েছেন ২১৭ জন, সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ২ হাজার ৭০ এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৬১৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন। চতুর্থ ধাপে সাধারণ ওয়ার্ড ৫০১টি এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ড ১৬৭টি। ভোটকেন্দ্র ৭৯৩টি। মোট ভোটার ১৬ লাখ ৬৭ হাজার ২২৪ জন।
পটিয়ায় কাউন্সিলর প্রার্থীর ভাই নিহত ঃ আমাদের পটিয়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, নির্বাচনে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে নিহত হয়েছেন আবদুল মাবুদ (৫০)। তিনি ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল মান্নানের ভাই। সংঘর্ষে অন্তত আট জন আহত হন। গতকাল রবিবার দুপুর ১২টায় পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ গোবিন্দারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের বাইরে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঘটনার এক পর্যায়ে ভোটকেন্দ্র এলাকায় স্থানীয় আনসার ভিডিপি ক্লাব ও কয়েকটি দোকানে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, ডিবি ও ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান চালিয়ে ঐ কেন্দ্রের দুই কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল মান্নান ও সরোয়ার কামাল রাজীবকে আটক করে। কিছুক্ষণ ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শী মোহাম্মদ এরশাদ জানান, সকাল থেকে সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ চললেও দুপুরের পর দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। গুলিতে কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল মান্নানের ভাই মারা গেছেন। আহতদের পটিয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুপুর ২টায় জাতীয় পার্টির প্রার্থী শামসুল আলম মাস্টার পটিয়ায় দলীয় কার্যালয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করেন। তিনি পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানান। অপরদিকে পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল খালেককে কে বা কারা অপহরণ করার অভিযোগ উঠেছে। তবে দুপুর ১২টার পর তাকে পুনরায় ছেড়ে দেওয়ার কথা জানান তিনি।
নরসিংদীতে ব্যালটে সিল, ককটেল বিস্ফোরণ ঃ নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, পৌরসভা নির্বাচনে ককটেল বিস্ফোরণ, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, ব্যালট পেপারে সিল মারাসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে চারটি কেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত করে বাকি কেন্দ্রগুলোর নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। সকাল সাড়ে ৮টায় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউএমসি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের তিনটি কেন্দ্রে ব্যাপক ককটেল বিস্ফোরণ, হামলা, ভাঙচুর, ব্যালট পেপার ছিনতাই ও প্রকাশ্যে সিল মারার কারণে নির্বাচন স্থগিত করা হয়। অন্যদিকে এক নম্বর ওয়ার্ডের বাসাইল কেন্দ্রে সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে ব্যালট পেপারে প্রকাশ্যে সিল মারার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহী প্রার্থী মোবাইল প্রতীকের সমর্থকদের মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয় নৌকা প্রতীকের লোকজন। মাধবদী পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আনোয়ার হোসেন এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মনির হোসেন অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন করেন।
কালিহাতীতে নৌকা-ধানের শীষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ : কালিহাতী (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুপুরে নৌকা ও ধানের শীষের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় দুই জন আহত হন। তারা হলেন যুবলীগ নেতা মো. জামাল উদ্দিন ও যুবদল নেতা মো. ইদ্রিস আলী। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে কালিহাতী পৌরসভা নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুমানা তানজিন অন্তরা অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং পরিবেশ শান্ত করেন।
সোনাইমুড়ীতে সংঘর্ষ-গুলিবর্ষণ : চাটখিল ও সোনাইমুড়ী (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, সোনাইমুড়ী পৌরসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলাকালে দুই মেয়র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া, সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। এতে মোহন (১৮) নামের এক যুবক গুলিবিদ্ধসহ অন্তত পাঁচ জন আহত হয়। অন্যদিকে ভোটারদের জোরপূর্বক নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করার অভিযোগে দুই এজেন্টকে আটক করে পুলিশ। কাউন্সিলর প্রার্থীদের দুই পক্ষের লোকজনের ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে একটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখা হয়। রবিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সোনাইমুড়ী পৌরসভার ৬ নম্বর ভাটরা কেন্দ্রে ও ৮ নম্বর কেন্দ্র কাঠালিয়া মোহাম্মদিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা এবং ১ নম্বর কৌশল্যারবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এসব ঘটনা ঘটে। গুলিবিদ্ধ মোহন সোনাইমুড়ী উপজেলার বাহারকুট গ্রামের আবদুল হকের ছেলে।
হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আহতরা জানান, তারা সবাই আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নৌকা প্রতীকের সমর্থক। সকালে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর তারা পৌরসভার ৬ নম্বর ভাটরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পাশের একটি বাড়িতে বসে ছিলেন। এ সময় স্বতন্ত্রপ্রার্থী যুবলীগ নেতা খোরশেদ আলমের সমর্থকরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা তাদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে মোহনের পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি লাগে। হামলার সময় দৌড়ে পালাতে গেলে মনির ও সালাউদ্দিনসহ আরো চার জনকে কুপিয়ে এবং পিটিয়ে জখম করে হামলাকারীরা।
এছাড়া বরিশালের বানারীপাড়া, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ ও বাগেরহাট পৌরসভায় বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা অনিয়মের অভিযোগে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। কেন্দ্রের ভেতর ‘হইচই’ করায় ময়মনসিংহের ত্রিশাল পৌরসভার এক কাউন্সিলর প্রার্থীকে দুই ঘণ্টা আটক রেখে ছেড়ে দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা পৌরসভা নির্বাচন ঘিরে জালভোট ও বিভিন্ন সহিংসতায় পাঁচ জন আহত হয়। এছাড়া পাঁচ জনকে আটক করা হয়েছে। লক্ষ্মীপুরের রামগতি পৌরসভায় উন্মুক্তভাবে নৌকায় ভোট দিতে বাধ্য করা, এজেন্টদের মারধর ও কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়ার অভিযোগ এনে ধানের শীষের প্রার্থী সাহেদ আলী পটু ও লাঙলের প্রার্থী আলমগীর হোসেন ভোট বর্জন করেন। এছাড়া ঠাকুরগাঁওয়ে বোমা ফাটিয়ে কেন্দ্র দখলের অভিযোগ তুলেছেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী।
