সুরাইয়া নীল। ২০ বছর বয়সী এই তরুণী র্যাম্প মডেল হিসেবে পরিচিত। অভিনয়ও করেছেন টিভি নাটক-সিরিয়ালে। নাটকে তাকে বিভিন্ন চরিত্রে দেখা গেছে। তবে বাস্তবের চরিত্র ভয়ঙ্কর। রাতারাতি বিপুল অর্থের মালিক হতে বেছে নিয়েছেন ব্ল্যাকমেইল থেকে শুরু করে মাদক বাণিজ্য। অপকর্মে ষোলআনা পূরণ করতে এই মডেল গড়ে তুলেছেন এক অপহরণকারী চক্র।
আসল পরিচয় তিনি সাতক্ষীরার সুলতানপুর বড় বাজারের আজমল হকের মেয়ে সুরাইয়া হক নীল। সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকা অবস্থায়ই একাধিক শিক্ষকের সাথে দুর্ব্যবহার করার অভিযোগ উঠে সুরাইয়ার বিরুদ্ধে। এমনকি স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগে বিয়ে করে তিনি।
সাতক্ষীরা থেকে শিল্পী ঐক্যজোটের সাথে যুক্ত হয়ে বছর তিনেক আগে ২০১৭ সালে জি.এম সৈকত এর মাধ্যমে মিডিয়াতে পদার্পণ করে সুরাইয়া। এটিএন বাংলার ধারাবাহিক নাটক ডিবি’র ‘র্যাম্প মডেল নীল’ গল্পের একটি বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করে সে। সেই নীল এখন অপহরণ চক্রের সাথে জড়িয়ে সারাদেশের গণমাধ্যমের খবর হয়েছে।
Police Bureau of Investigation (পিবিআই) এর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। পাঠকদের জন্য পিবিআইয়ের পেজে বর্ণিত ঘটনা হুবহু তুলে ধরা হলো-
“ক্রাইম পেট্রোল দেখে মডেল কন্যার দ্বারা ফিল্মি স্টাইলে অপহরণ অপহৃত ভিকটিম সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উদ্ধার এটি কোন সিনেমার গল্প নয়; নয় কোন রূপকথার কল্প কাহিনী। এখানে যা মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে তা এক মডেল কন্যার অভিনব অপহরণের নির্মম বাস্তবতা। সঙ্গে সিদ্ধহস্ত কয়েকজন অভিনেতা। অর্থের লোভে তাদের নির্মিত নাটক, সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
ক্রাইম পেট্রোল দেখে পরিকল্পনা। আর এই পরিকল্পনার নেপথ্যে মডেল কন্যা সুরাইয়া নীল (২০) যে চলচ্চিত্র, নাটক ও মিউজিক ভিডিওতে কাজ করেছে। গত ০৬/০২/২০২১ সকাল ০২:৩০ ঘটিকার সময় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবু হেনা মোস্তফা ওরফে মিলন (৩৩), পিতা- এম এ হাকিম, থানা-তালা, জেলা-সাতক্ষীরা নিজ বাড়ি হয়ে খুলনা পাইওনিয়র কলেজের সামনে তার হবু স্ত্রী রাবেয়া সুলতানা রিতুর সাথে দেখা করে এবং তারা একত্রে ঘুরতে যায়। এমন ঘটনা মোটেও বিচিত্র নয়। তিনি এমন কি কখনও ভেবেছেন তার হবু স্ত্রী তাকে অপহরণ করতে যাচ্ছে নিছক অর্থের লোভে। তিনি না ভাবলেও এমনটি ঘটেছে তার জীবনে। হবু স্ত্রীর বান্ধবী মডেল কন্যা সুরাইয়া নীল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে তাকে ফোনে বলেন, শ্যালিকার বাসায় এক কাপ চা খেয়ে যাবেন না তা কি হয়। তিনি অপরিচিত কারো বাসায় যাবেন না সাফ জানিয়ে দেন। কোনভাবে তাকে রাজি করাতে না পেরে মডেল কন্যা নিজেই এসে তার হবু স্ত্রীসহ তাকে মডেল কন্যার বাসায় নিয়ে যান। তাদের কথা বলার এক পর্যায়ে নাটকীয় কায়দায় কিছু বুঝে উঠার আগেই আইনজীবীর হাত-পা বেঁধে ফেলেন মডেল কন্যা সুরাইয়া নীল এর স্বামী হাবিব মিলন ওরফে রাজ (২৪) এবং রাজের বন্ধু আব্দুস সালাম (২৪)। পরবর্তীতে সন্ধ্যা অনুমান ০৬টা ২০ঘটিকার সময় আবু হেনা মোস্তফা ওরফে মিলন তার বন্ধু হাফিজকে ফোন করে, সে খুব বিপদে আছে এবং তার টাকা প্রয়োজন। হাফিজ তাকে বিকাশের মাধ্যমে ১০,০০০/- টাকা পাঠায়। পরে নিজেদের পরিচয় গোপন করে আবু হেনা মোস্তফা ওরফে মলিন এর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন দিয়ে পর্যায়ক্রমে তার পিতা এবং দুলাভাইকে ফোন করে ৩০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে ও তাকে মারপিট করে কান্নার আওয়াজ শুনায়। মুক্তিপন না দিলে তারা আবু হেনা মোস্তফা ওরফে মিলন কে হত্যা করবে বলে জানায়।
ক্রাইম পেট্রোল দেখে মডেল কন্যার দ্বারা ফিল্মি স্টাইলে অপহরণঃ অপহৃত ভিকটিম সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবি উদ্ধার এটি কোন...
Posted by Police Bureau of Investigation on Tuesday, February 9, 2021
পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বিপিএম (বার) পিপিএম, ডিআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ এর প্রত্যক্ষ দিক নির্দেশনায় পিবিআই যশোর জেলা ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন এর নেতৃত্বে এসআই স্নেহাশিষ দাস, এসআই গোলাম আলীসহ যশোর জেলার চৌকস দল কর্তৃক গত ০৯/০২/২০২১ খ্রি. রাত অনুমান ০২:৩০ ঘটিকায় মুক্তিপণ এর টাকা নিতে যাওয়া মোঃ শাহীন শিকদার (১৮) পিতা-আলাউদ্দিন শিকদারকে গ্রেফতার করে। তাকে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে আব্দুস সালাম (২৪), পিতা-মোঃ জমির সরদার, উভয় সাং-ফরমায়সেখানা (দয়োড়া), থানা-দিঘলিয়া, জেলা-খুলনা এবং সুরাইয়া (২০) পিতা-মৃত আজমল হক, সাং-সুলতানপুর, বড়বাজার, থানা-সাতক্ষীরা সদর, জেলা-সাতক্ষীরাকে যশোর জেলার অভয়নগর থানাধীন একতাপুর গ্রামে রাবেয়া খাতুনের বাড়ি হতে গ্রেফতার করা হয় এবং ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ভিকটিম আবু হেনা মোস্তফা ওরফে মিলন পেশায় একজন আইনজীবী। তার সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি থানাধীন প্রতাবনগর গ্রামের এসএম হারুনর রশিদ এর কন্যা রাবেয়া সুলতানা রিতু (২২) এর সাথে পারিবারিকভাবে বিবাহ ঠিক হয়। অভিযুক্ত সুরাইয়া রিতুর বান্ধবী।
গত ০৬/০২/২০২১ খ্রি. দুপুর বেলা আবু হেনা মোস্তফা ওরফে মিলন রাবেয়া সুলতানা রিতুর সাথে খুলনা পাইওনিয়র কলেজের সামনে দেখা করে এবং তারা একত্রে জাহানাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পার্কে ঘুরতে যায়। সেখানে তাদের অভিযুক্ত সুরাইয়ার সাথে দেখা হয়। সুরাইয়া ভিকটিম আবু হেনা মোস্তফা ওরফে মিলন কে কৌশলে যশোর জেলার অভয়নগর থানাধীন একতাপুর গ্রামের রাবেয়া খাতুনের বাড়িতে নিয়ে যায়। এক মাস পূর্বে উক্ত বাড়িতে অভিযুক্ত সুরাইয়া ও আব্দুস সালাম স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাড়াটিয়া হিসেবে উঠে।
পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বিপিএম (বার) পিপিএম, ডিআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ বলেন কোথাও অপরাধের সংবাদ পাওয়া মাত্র আমরা টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ শুরু করে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত লেগে থাকি।
পিবিআই যশোর জেলা ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন বলেন, আমরা খুবই খুশি যে ভিকটিমকে জীবিত উদ্ধার করতে পেরেছি। পিবিআই এর সুনামের কারণেই ভিকটিমের পরিবার সরাসরি পিবিআই এর কাছে ছুটে এসেছে।”
উল্লেখ্য, তালা উপজেলার বারুইহাটি গ্রামের এমএ হাকিমের আইনজীবী পুত্র আবু হেনা মোস্তফা মিলনের সাথে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর গ্রামের এসএম হারুনুর রশিদের মেয়ে রাবেয়া সুলতানা রিতুর বিয়ে ঠিক হয়। এরই সূত্র ধরে ৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে মিলন খুলনা পাইওনিয়ার কলেজের সামনে রিতুর সঙ্গে দেখা করেন। পরে তারা জাহানাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পার্কে ঘুরতে যায়। এ সময় রিতুর বান্ধবী সুরাইয়ার সঙ্গে তাদের দেখা। এক পর্যায়ে সুরাইয়া নিজেকে মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মিলনের সঙ্গে সখ্যতা তৈরি করে। এরপর কৌশলে সুরাইয়া মিলনকে যশোরের অভয়নগর এলাকায় নিয়ে আসেন। সেখানে আইনজীবী মিলন কিছু বুঝে উঠার আগেই তার হাত-পা বেঁধে জিম্মি করে এবং শারীরিক নির্যাতন করে। এরপর তারা ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এ ঘটনায় আইনজীবীর পরিবারের পক্ষ থেকে তালা থানায় অভিযোগ করা হয়। উক্ত অভিযোগের সূত্র ধরে গত ৯ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) যশোরের অভয়নগর থানাধীন একতাপুর গ্রামের রাবেয়া খাতুনের বাড়ি হতে মডেল কন্যা সুরাইয়াসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে পিবিআই।
ইত্তেফাক/বিএএফ
