প্রতিদিন হোক শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:১৩

ভাষার জন্য আত্মোত্সর্গের নজির বিশ্বে একমাত্র আমাদেরই রয়েছে। তাই তো ইউনেস্কো আমাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এই ঘোষণা বাংলা ভাষার মর্যাদাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে আমাদের গর্ব ও অহংকার। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরাই আবার এই মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করছি প্রতিনিয়ত। ভাষা আন্দোলনের পর প্রায় সত্তর বছর পার হয়ে গেলেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন করা সম্ভব হয়নি এবং শুদ্ধ বাংলা চর্চার তাগিদও নেই। এফএম রেডিও, টিভি ও মঞ্চের তরুণ উপস্থাপকরা ইংরেজি বাংলা হিন্দি মিলিয়ে এক অভিনব ভাষায় কথা বলে। মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা উপস্থাপকদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখে। তাই তাদের ভাষা মার্জিত হওয়া উচিত।

আমার মনে হয়, আজকাল কিছু মানুষ নিজেদের স্মার্ট হিসেবে জাহির করতেই কথা বলার সময় দু-চারটা ইংরেজি বলেন। ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুস’ সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরের এই বিখ্যাত উক্তিটি আমরা ভুলে যাইনি। শুধু যে বাংলার মধ্যে ইংরেজি তা-ই নয়, বিকৃত উচ্চারণ ও ভুল বানানের ছড়াছড়িও লক্ষণীয়। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন প্রিয় মাতৃভাষার অমর্যাদা করা হয়, অন্যদিকে ভাষাশহিদদের আত্মদানকেও করা হয় অসম্মান।

একুশের চেতনা তরুণদের মধ্যে প্রায় অনুপস্থিত। আমরা যখন স্কুল-কলেজের ছাত্র ছিলাম তখন যে উত্সাহ-উদ্দীপনায় একুশ পালন করতাম বা যে সংখ্যায় প্রভাতফেরিতে অংশ নিতাম তা এখন দেখা যায় না। এজন্য হয়তো আমরা বড়রাই দায়ী। শহরকেন্দ্রিক তরুণ-যুব সমাজের মধ্যে সুন্দর এবং শুদ্ধ করে বাংলা বলার ক্ষেত্রেও অনীহা লক্ষণীয়। বাংলা হিন্দি এবং ইংরেজি মিলিয়ে খিচুড়ি করতে ওস্তাদ ওরা। কোনোটাই ঠিক হয় না। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের একটা ঘটনা মনে পড়ছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার জাহাজে করে বিদেশ থেকে ফিরছিলেন। একই জাহাজে বিলেত থেকে সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা এক বাঙালি যুবকও ছিলেন। যুবক যখন জানলেন জাহাজে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আছেন তখন তিনি ভাবলেন, যাই কবিগুরুর সঙ্গে একটু গল্প করে আসি। যুবক ইঞ্জিনিয়ার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলছিলেন। কথার মাঝে একসময় তিনি কিছুটা কৈফিয়তের সুরে বললেন, ‘দীর্ঘদিন বিদেশে থাকতে থাকতে বাংলা ভুলে গিয়েছি। তাই ইংরেজি বলছি।’ কবি তখন স্মিত হেসে বললেন, ‘তাতে দুঃখ ছিল না যদি ইংরেজিটাও শুদ্ধ করে বলতে।’

আমাদের তরুণদের অবস্থা অনেকটা ঐ যুবকের মতো। এরা ইংরেজি হিন্দি আর বাংলা মিলিয়ে ‘হিংবাংলিশ’ করে ফেলছে। মাতৃভাষার মর্যাদার প্রতি তাদের যেন কোনো অঙ্গীকারই নেই। পৃথিবীর উন্নত জাতি তাদের নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতির ব্যাপারে কোনো আপস করে না। কিন্তু আমাদের দেশে রক্তরঞ্জিত বাংলা বর্ণমালার অবমাননা দেখি সর্বত্র। তাই একুশের প্রাক্কালে একটাই শপথ হোক—আমরা যেন নিজ ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি তরুণ প্রজন্মের অনুরাগ সৃষ্টি করতে পারি। আর কোনো নির্দিষ্ট দিনে নয়, প্রতিদিন হোক শুদ্ধরূপে বাংলাভাষা চর্চা।

খুলনা