উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষা

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৯:৪৩

বিশ্বজিত্ ঘোষ

ঐতিহাসিক গৌরবদীপ্র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয় ১৯৫২ সালে। এরপর অতিক্রান্ত হয়েছে দীর্ঘ প্রায় সত্তর বছর। সুদীর্ঘ এই সময়ে নানা ইতি-নেতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে আমাদের জাতীয় জীবন। দীর্ঘ বঞ্চনা এবং নানামাত্রিক ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে আমরা মুক্তি লাভ করেছি, অর্জন করেছি আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। কিন্তু জাতীয় জীবনে বাংলা ভাষা প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে কতটুকু? বাংলা ভাষা এগিয়েছে কতটা? বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থাই-বা কেমন? স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত হয়, দেখা দেয় বাংলা ভাষার অফুরন্ত সম্ভাবনা। কিন্তু বাস্তবে ঘটে উলটো ফল। অল্প কিছুদিনের জন্য প্রশাসন এবং আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহূত হলেও,  ১৯৭৫-এর মধ্য আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর দ্রুত তা থমকে যায়—দেখা দেয় ইংরেজির দাপট। সরকারি বড়কর্তা ভুল ইংরেজি লিখলে লজ্জিত হন, কিন্তু ভুল বাংলায় তার কোনো ভাবান্তর হয় না; বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উচ্চ জ্ঞানের কথা ইংরেজি ছাড়া বলতে পারেন না। অথচ গোটা উনিশ শতকে চিকিত্সা-প্রকৌশলসহ উচ্চস্তরের পড়ালেখা বাংলা ভাষায় চলত—এ কথা তো ঐতিহাসিক সত্য। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে রক্তাক্ত বিজয়ের পরেও বাংলা ভাষাকে দমিয়ে রাখার নানা ষড়যন্ত্র চলতে থাকে প্রকাশ্যে-গোপনে। তাই পরাজিত হয়েও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তি মূল আন্দোলনটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সক্ষম হয়। ফলে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন হয় বাধাগ্রস্ত, যা স্বাধীন বাংলাদেশেও, পঁচাত্তরের পর, দীর্ঘদিন চলতে থাকে অব্যাহত গতিতে। বিগত এক যুগে এ ধারার পরিবর্তন ঘটেছে, নানা ইতিবাচক উদ্যোগের ফলে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনে তৈরি হয়েছে জাতীয় সচেতনতা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন—‘শিক্ষায় মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধস্বরূপ।’ এ কথা দিয়ে তিনি এটাই বলতে চেয়েছেন যে, শিশু যেমন মাতৃদুগ্ধ পান করে জীবনধারণ করে, তেমনি মাতৃভাষার মাধ্যমেই ব্যক্তির শিক্ষার্জন সার্থকতামণ্ডিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে রবীন্দ্রনাথের উপর্যুক্ত কথার কোনো প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যাবে না। অবাক বিস্ময়ে এ কালে আমাদের শুনতে হচ্ছে বাংলায় উচ্চশিক্ষা সম্ভব নয়। কেন? উনিশ শতকে যদি চলতে পারে, তাহলে একালে নয় কেন? এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর আমাদের জানা নেই। তবে একটা উত্তর অনেকে নিশ্চয়ই বলবেন, সেটা হচ্ছে চাকরির বাজার বা জব-মার্কেট। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি হয় জব-মার্কেটে চাকরিপ্রার্থীদের সাফল্যের সনদ সরবরাহকারী দোকান, তাহলে আমাদের কিছু বলার নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশই অবশ্য এ পথেই হাঁটছে। সেখানে বাংলা ভাষায় কথা বলা রীতিমতো পাপ। ভুল ইংরেজি হোক, নাকানিচুবানি খাওয়া ইংরেজি হোক—কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু বাংলা কিছুতেই নয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলেও সেখানে চিঠিপত্র, বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে যাবতীয় কর্ম সাধিত হয় ইংরেজি ভাষায়। ইংরেজি বিভাগ ছাড়াও চাকরির বাজারের কথা মনে রেখে সব শিক্ষার্থীকেই বাজার অর্থনীতি, কম্পিউটার, ব্যবসামুখী ইংরেজি এসব শেখানো হয় ‘অতি যত্নের সঙ্গে’। কিন্তু বাংলা? ওটা তো মামার বাড়ির ভাষা। ওটা আবার শেখানোর বিষয় হলো কবে? ওটা তো নানি আর দিদিমার হাতের মোয়া—চাইলেই পাওয়া যায়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একই অবস্থা বিরাজ করছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে, চিকিত্সা ও প্রকৌশল শিক্ষায়। ১৯৫২ সালে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তি বাংলা ভাষা ধ্বংসের চূড়ান্ত ষড়যন্ত্রে নেমেছিল। এখন আর বিদেশি শক্তি নয়, আমরা নিজেরাই নেমেছি মাতৃভাষা ধ্বংসের ‘ন্যায়যুদ্ধে’। ফেব্রুয়ারি এলে আমরা মাতৃভাষা বাংলার জন্য বিগলিত হই বটে, তারপর আবার ‘পুনঃ মূষিক ভব’। লোককথায় বাঘকে মূষিক বানিয়েছিলেন মুনি, কিন্তু আমাদের মাতৃভাষাবিরাগী করল কে? বোধ করি, সবাই হাত তুলে বলবেন—বাজার-চাহিদা। আর এজন্যই বুঝি শিক্ষার্থীদের এখন একমাত্র পড়ার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যবসাশাস্ত্র। বিশ্বায়ন নামের অদ্ভুত এক স্বর্ণডিম্বের ঝাপটায় সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে আমরা বাজারপানে ছুটছি তো ছুটছিই। সেখানে মাতৃভাষা বাংলা আবার কোন ঝামেলা?

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রায় সত্তর বছর পরে বাংলা ভাষা ব্যবহারে কিছুই কি ইতিবাচক প্রবণতা নেই? আছে, অনেক কিছুই আছে। বর্তমানে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য একটা সচেতনতা তৈরি হয়েছে। বাংলা একাডেমিসহ অনেক প্রতিষ্ঠান এখন উচ্চশিক্ষার অনেক বই বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করছে। শিক্ষকদের এদিকে এগিয়ে আসতে হবে। উচ্চশিক্ষার জন্য অন্য ভাষার প্রয়োজনীয় বই বাংলায় অনুবাদে প্রয়াসী হতে হবে, শ্রেণিকক্ষে বাংলায় বক্তৃতা দিতে হবে, শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষা ব্যবহারে উত্সাহিত করতে হবে।

উচ্চশিক্ষায় মাতৃভাষার দুরবস্থা দূর করা জরুরি। এ কথা কেবল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নন, সব শিক্ষা-চিন্তকই বলেছেন যে, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষালাভ না করলে কোনো শিক্ষাই পূর্ণতা পায় না। এজন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা ইংরেজি শিখব, শিখব আরো অনেক ভাষা। কিন্তু অবশ্যই শিখব মাতৃভাষা বাংলা। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সব শাখাতেই শিক্ষার্থীকে বাংলা ও ইংরেজি—এ দুটো ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। ইংরেজির জন্য মনোযোগ থাকলেও, এক্ষেত্রে বাংলার অবস্থা খুবই শোচনীয়। বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষা সম্ভব নয়—এ ধারণা যে ভ্রান্ত, তা প্রমাণ করতে হবে বাংলাভাষী পণ্ডিতদের।

বাংলা অনেক শক্তিশালী এবং সুশৃঙ্খল ভাষা। এ ভাষায় উচ্চশিক্ষার যে-কোনো বিষয়ই প্রকাশ করা সম্ভব। এজন্য চাই সচেতনতা এবং আন্তরিকতা। প্রসঙ্গত মনে পড়ে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের আট মাস পরে, বেইজিংয়ে আয়োজিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর শান্তি সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান অংশগ্রহণ করেন। সেই শান্তি সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেন। উত্তরকালে এ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন :‘আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম।...কেন বাংলায় বক্তৃতা করব না?...পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য।...আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য।’ বঙ্গবন্ধুর চেতনার এই কর্তব্যবোধ যদি আমাদের চেতনায় জাগ্রত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলিত হবে, বাংলা ভাষা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারবে আমাদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে।

 

u লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক।