জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বলেছেন, উন্নয়ন হচ্ছে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন সাধন। রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, বিদ্যুতের ব্যবস্থা—এসব হচ্ছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন না হলে শিক্ষা-সংস্কৃতি, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে উন্নয়নের সুফল পাওয়া যাবে না। পরিকল্পনা মাফিক উন্নয়নকাজ করতে হয়।
গতকাল শনিবার পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়ায় পোনা নদীর ওপর নবনির্মিত পিসি গার্ডার সেতু ও নতুন বাইপাস সড়ক উদ্বোধন উপলক্ষ্যে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ‘আল্লাহতায়ালার অসীম রহমতে দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে ভাণ্ডারিয়াসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য যে উন্নয়ন অবকাঠামোর প্রয়োজন ছিল, এমন গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রকল্প আমরা বাস্তবায়নে সক্ষম হয়েছি। এর মূলে কোনো দল বা সরকারের অবদানই শুধু ছিল না, আল্লাহর রহমতও প্রয়োজন ছিল। মানুষের ঐক্যবদ্ধ সমর্থন ও প্রচেষ্টা আমাদের কাজের সহায়ক থাকায় কাঙ্ক্ষিত কাজগুলো সম্পন্ন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ হওয়ায় আমাদের এ অঞ্চলের অভাব-অনটন তিনি উপলব্ধি করেন।’ তিনি বলেন, ‘অবশ্যই দেশে রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল থাকবে, তবে এলাকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবার মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। ভাণ্ডারিয়া-কাউখালী এবং ইন্দুরকানীতে এ ঐক্য ছিল বলেই এখানকার উন্নয়ন অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।’
জেপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি সব সময় ঐক্যের কথা বলে এসেছি। যে সরকারই আসুক না কেন, ঐক্য থাকলে উন্নয়ন হবেই। পাকিস্তান আমলে আমরা স্বাধীনতার জন্য রাজপথে আন্দোলনে ছিলাম। নতুন প্রজন্মকে যে কথা বলা প্রয়োজন তা হলো, পরাধীন আমল ও স্বাধীনতা-উত্তরকালের রাজনীতি এক নয়। পরাধীন আমলের রাজনীতি ছিল ভাঙার রাজনীতি, উত্খাতের রাজনীতি। আজ আমাদের বুঝতে হবে স্বাধীনতার স্বপ্ন কী ছিল, লক্ষ্য কী ছিল।’ তিনি বলেন, ‘আমি ভাণ্ডারিয়ায় ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পর্যায়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করি না। আমার শেষ নসিহত হচ্ছে, পৃথিবীতে কেউ চিরদিন বেঁচে থাকে না। ভাণ্ডারিয়ায় শিক্ষা বিস্তারে অনেক অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। আজকে স্কুল-কলেজে বহুতল ভবন হচ্ছে, কোথাও কোথাও লিফটও স্থাপিত হবে। মনে রাখতে হবে, যোগ্য নেতৃত্বের জন্য লেখাপড়ার কোনো বিকল্প নেই।’
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ‘তত্কালীন ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলার ভাণ্ডারিয়া সফরকালে সবাই ঐকমত্যের ভিত্তিতে অংশগ্রহণ করেছিলাম বলেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ভারত সরকারের অর্থায়নে উপজেলার মানুষের জন্য আমরা সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা পেয়েছি। মানুষ ঐক্যবদ্ধ থাকলে সেই এলাকায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটে।’
জেপির চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘আমার ১৮ বছরের মন্ত্রিত্বের মধ্যে ১০ বছরই যোগাযোগমন্ত্রী ছিলাম।’ পোনা নদীতে সেতু নির্মাণের ধারাবাহিকতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরপর দুবার বেইলি ব্রিজ নির্মাণের পর আজ আমরা ২০০ মিটার দীর্ঘ গার্ডার সেতু উদ্বোধন করলাম। নতুন বাইপাস সড়কসহ (চরখালী-বটতলা) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক সংযুক্ত হলো। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর নামে এই সড়ককে উত্সর্গ করে জাতির পিতাকে ভাণ্ডারিয়াবাসী মুজিববর্ষে সম্মান জানাল। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এ অঞ্চলের নতুন প্রজন্মের কর্মমুখী শিক্ষা অর্জনের জন্য একটি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট করতে ইতিমধ্যে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।
সমাবেশে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের পিরোজপুর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ মাহমুদ সুমন বলেন, এই অঞ্চলে আরো দুটি আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ সড়ক দুটি হচ্ছে ভাণ্ডারিয়া-শিয়ালকাঠী-কাউখালী এবং কাউখালী-নৈকাঠী সড়ক। ভাণ্ডারিয়া বড় মসজিদের খতিব মাওলানা জাকারিয়া আল ফরিদি মোনাজাতকালে বলেন, ‘আল্লাহর নেয়ামত হিসেবে আমরা ভাণ্ডারিয়াবাসী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সাহেবকে পেয়েছি। তিনি আমাদের জন্য তার যোগ্য উত্তরসূরি রেখে যাবেন, আল্লাহর কাছে এ দোয়া করি।’
সমাবেশে উপস্থিত থেকে দোয়া-মোনাজাতে অংশ নেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর কনিষ্ঠ কন্যা দৈনিক ইত্তেফাকের অন্যতম পরিচালক ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক আনুশে হোসেন, ভাণ্ডারিয়া উপজেলা জেপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাহিবুল হোসেন মাহিম, উপজেলা চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নাজমুল আলম নবীন, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধা, উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আসমা আকতার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফায়জুর রশিদ খশরু জোমাদ্দার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুমুর রহমান বিশ্বাস, ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের মধ্যে সিদ্দিকুর রহমান টুলু (ধাওয়া), মজিবর রহমান চৌধুরী (গৌরীপুর), খান এনামুল করিম পান্না (ভিটাবাড়িয়া), হুমায়ুন কবির হাওলাদার (ইকরি), শামসুদ্দিন হাওলাদারসহ (তেলিখালী) বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ।
প্রসঙ্গত, পিরোজপুর সড়ক বিভাগের অধীন ‘বরিশাল-ঝালকাঠি-রাজাপুর-ভাণ্ডারিয়া-পিরোজপুর (আর-৮৭০) সড়কের’ ৪৬তম কিলোমিটারে পোনা নদীর ওপর এই পিসি গার্ডার সেতুটি নির্মিত হয়েছে। তত্কালীন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি ২০১৭ সালের ২৯ জুলাই ২০০ মিটার দীর্ঘ এই সেতুটির নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। গতকাল তিনি ভাণ্ডারিয়া থানা কমপ্লেক্স ভবনের নির্মাণকাজও পরিদর্শন করেন।
