সরকারি প্রকল্প বা কাজে কালক্ষেপণ উন্নয়নশীল বিশ্বের এক বড় সমস্যা। বাংলাদেশও তাহার ব্যতিক্রম নহে; কিন্তু এই প্রবণতা হইতে বাহির হইয়া আসিবার কোনো চিন্তাভাবনা বা উদ্যোগ কি আমাদের আছে? প্রায়শ পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্টসহ বিভিন্ন সরকারি কাজ যথাসময়ে শেষ হইতেছে না। অনেক সময় দেখা যায়, কাজ অর্ধেক বা কিছুটা করিয়াই ঠিকাদার লাপাত্তা হইয়া গিয়াছেন। আবার কাজ বাস্তবে না করিয়াও বিল উঠাইয়া নেওয়ার নজির এই দেশে কম নহে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাবকনট্রাকটররা ঠিক সময়ে কাজ শেষ করিতে পারেন না বা গড়িমসি করেন। এমনিতে আমাদের দেশে কোনো কাজের জন্য যে অর্থবরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহা বিভিন্ন হাত ঘুরিয়া আসিবার কারণে যতটুকু দেওয়া প্রয়োজন, ততটুকু ঠিকাদারদের নিকট আসিয়া পৌঁছে না; কিন্তু যতটুকু তাহার হস্তগত হয়, ততটুকু কাজও কি সম্পন্ন হয়? ইহার মূল সমস্যা কোথায় তাহা গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিতে হইবে।
সঠিক সময়ে সরকারি কাজ সম্পন্ন করা ও দেখভালের জন্য পিডি হইতে শুরু করিয়া এক্সইএন, এসও, এসডিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাগণ রহিয়াছেন। সরকারি কাজ যথাসময়ে না হইলে তাহারা কি ইহার দায়দায়িত্ব এড়াইতে পারেন? অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যাহারা কাজে অবহেলা করিতেছেন, তদারকিতে উদাসীনতার পরিচয় দিতেছেন, তাহাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হইতেছে না। ইহার জন্য প্রয়োজনে দুদকে অভিযোগ দায়ের করা যাইতে পারে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই ব্যাপারে সোচ্চার হইতে পারেন। এই পরিস্থিতির জন্য দুইটি কারণ দায়ী। প্রথমত বাম হাতের কারবারের কারণে সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার বা কর্মকর্তাগণ বিষয়টি লইয়া উচ্চবাচ্য করেন না। দ্বিতীয়ত যে সমস্ত ঠিকাদার কাজ করেন, তাহাদের সহিত প্রায়শ থাকে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা প্রভাবশালী মহলের সহিত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। ফলে এই ধরনের অনিয়মের তদন্ত বেশিদূর আগাইতে পারে না। এই দুর্বৃত্তায়নের ঘেরাটোপ অবশ্যই ভাঙিতে হইবে। দেশ পরিচালনাকারীদের উচিত এই জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কথায় বলে—সোজা আঙুলে ঘি উঠে না। ঘি উঠাইতে হইলে আঙুল কিছুটা বাঁকা করিতে হয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে ইহা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নাই।
প্রকল্পের কাজে কেন বিলম্ব হয়, তাহা লইয়া সাম্প্রতিক কালে খোদ প্রধানমন্ত্রীও ক্ষোভ প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি একজন অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক। প্রায় দেড় যুগ ধরিয়া প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করিয়া আসিতেছেন। তিনি যখন এই ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, তখন তাহা হতাশা ব্যক্ত করিবারই নামান্তর। বিভিন্ন প্রকল্প দেখাশুনার জন্য প্রকল্প পরিচালকগণ (পিডি) রহিয়াছেন। তাহারা কি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করিতেছেন? একজন ব্যক্তিকে একাধিক প্রকল্পের দায়িত্ব কেনইবা দেওয়া হয়? এইখানে কি উপযুক্ত কর্মকর্তার অভাব রহিয়াছে? অনুসন্ধান করিলে দেখা যাইবে, সরকারি অনেক কর্মকর্তার তেমন কোনো কাজ নাই। তাহারা বসিয়া বসিয়া সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করিতেছেন। তাহা হইলে একজনকে একাধিক প্রকল্পের দায়িত্বভার কেন দেওয়া হইবে? কনট্রাকটর কাজ ঠিকমতো না করিলে কেন তাহার লাইসেন্স বাতিল করা হইবে না? সরকারি কাজ পাইবার জন্য ঠিকাদারদের যে শ্রেণিবিভাগ করা হইয়াছে, তাহা লইয়াও ভাবিতে হইবে। ছোট ঠিকাদারদের কাজ পাইবার শর্তাবলি যদি সহজতর করা হয়, তাহা হইলে এই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হইতে পারে।
আমাদের প্ল্যানিং কমিশনের জেনারেল ইকোনমিক ডিভিশন আছে, আছে আইএমইডি তথা ইমপ্লিমেন্টেশন মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন ডিপার্টমেন্ট। তাহারা হিসাব করিয়া দেখিয়াছেন, প্রকল্পের প্রাথমিক যে প্রাক্কলন করা হয়, সেখানেই ব্যয় অধিক ধরা হয়। তাহার পরও কাজে বিলম্ব করা হয় যাহা অনৈতিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। প্রকিউরমেন্টের সময় আরেক দফা অনিয়ম ও দুর্নীতি চলে। ইহাও বন্ধ করা দরকার। মোটকথা, সরকারি প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বৃদ্ধি করা যাইবে না।
