শিক্ষকের মর্যাদা ও আমাদের কর্তব্য

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:১৪

জাজাফী

বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমাদের জীবনটা বদলে যায়। বাবা-মায়ের স্নেহের ছায়াতলে বেড়ে উঠতে থাকা এই আমরা তখন দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাই বাবা-মা ছাড়া। সেই সময়ে আমরা যেন দুঃখ না পাই, আমরা যেন আনন্দে থাকি, নতুন নতুন বিষয় শিখতে পারি, সেজন্য আমাদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে, ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে আমাদের জড়িয়ে রাখে দুটি হাত। ওই দুটি হাত শিক্ষকের হাত। বাবা-মায়ের অবর্তমানে শিক্ষকই হয়ে ওঠেন আমাদের বাবা-মা। আমাদের হাসি-কান্না আনন্দ-বেদনার সাক্ষী থাকেন তাঁরা। আমাদের আদর করেন, ভালোবাসেন; আবার পড়া না পারলে বকাও দেন। বাবা-মায়ের পরই শিক্ষকের মযার্দা দেওয়া হয়েছে। বিখ্যাত লেখক আবদুল কাদির ‘শিক্ষকের মযার্দা’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন—যেখানে আমার দেখেছি বাদশাহ আলমগীরের ছেলেকে দিল্লির এক মৌলভী পড়াতেন। বাদশাহের ছেলে সেই শিক্ষকের পা ধুয়ে না দিয়ে শুধু পানি ঢেলেছিল বলে বাদশা রাগ করেছিলেন এবং বলেছিলেন, হাত দিয়ে ধুয়ে দেওয়া উচিত। ইতিহাস বলে, যুগে যুগে অতি অত্যাচারী শাসকও নতশিরে গুরুর সামনে দাঁড়িয়েছেন। গুরুকে অসম্মানের ধৃষ্টতা কেউ দেখাননি।

পৃথিবীর সবথেকে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকার তত্কালীন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাই শিক্ষককে নিজের পুত্রের ব্যাপারে যে চিঠি লিখেছিলেন, তা হয়ে উঠেছে ইতিহাসের দলিল। তিনি লিখেছিলেন—

‘আমার পুত্রকে জ্ঞানার্জনের জন্য আপনার কাছে প্রেরণ করলাম। তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন—এটাই আপনার কাছে আমার বিশেষ দাবি।

‘আমার পুত্রকে অবশ্যই শেখাবেন—সব মানুষই ন্যায়পরায়ণ নয়, সব মানুষই সত্যনিষ্ঠ নয়। তাকে শেখাবেন পাঁচটি ডলার কুড়িয়ে পাওয়ার চেয়ে একটি উপার্জিত ডলার অধিক মূল্যবান। এও তাকে শেখাবেন, কীভাবে পরাজয়কে মেনে নিতে হয় এবং কীভাবে বিজয়োল্লাস উপভোগ করতে হয়। হিংসা থেকে দূরে থাকার শিক্ষাও তাকে দেবেন। আমার পুত্রকে শেখাবেন—বিদ্যালয়ে নকল করার চেয়ে অকৃতকার্য হওয়া অনেক বেশি সম্মানজনক।

‘আমার পুত্রের প্রতি সদয় আচরণ করবেন, কিন্তু সোহাগ করবেন না। কেননা আগুনে পুড়েই ইস্পাত খাঁটি হয়। আমার সন্তানের যেন অধৈর্য হওয়ার সাহস না থাকে, থাকে যেন সাহসী হওয়ার ধৈর্য। তাকে এ শিক্ষাও দেবেন—নিজের প্রতি তার যেন সুমহান আস্থা থাকে আর তখনই তার সুমহান আস্থা থাকবে মানবজাতির প্রতি।’

যে জাতি বা দেশের শিক্ষার অবকাঠামো ও শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ যত উন্নত, দেশ ও জাতি হিসেবে সার্বিকভাবে তারাই উন্নত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। আর এই জাতি গঠনে মূল কাজটি করেন আমাদের শিক্ষকরা। আগামী ১৯ জানুয়ারি জাতীয় শিক্ষক দিবস। ২০০৩ সালে ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার নিয়ে তত্কালীন সরকার এ দিবসটি চালু করে। আমাদের উচিত শিক্ষকের মযার্দা রক্ষা করা এবং তাঁদের কাছ থেকে জীবনের দিকনির্দেশনা শিখে নেওয়া। পড়া না পারলে শিক্ষক বকলে মনে মনে রাগ না করে সেটিকে মেনে নিয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করা। পক্ষান্তরে শিক্ষকদেরও উচিত আব্রাহাম লিংকনের সেই চিঠির কথা মনে করে নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা। ছাত্র-ছাত্রীকে সন্তানের মতো আগলে রাখতে পারাই শিক্ষকের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। তখনই শিক্ষক হয়ে ওঠেন বাবা-মা সমতুল্য।