যতদূর জানা যায়, বিশ্বে ৭ হাজার ১১৭টি সক্রিয় ভাষা রয়েছে। কিন্তু এই ভাষাগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশ হুমকির মুখে। মাত্র ২৩টি ভাষায় পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ কথা বলে। ইংরেজি ভাষায় সবচেয়ে বেশি মানুষ (১,১৩২ মিলিয়ন) কথা বলে। এর পরের অবস্থান ম্যান্ডারিন চাইনিজ (১,১১৭ মিলিয়ন) ভাষার। তবে স্থানীয় ভাষা হিসেবে প্রথম স্থান দখল করে নিয়েছে ম্যান্ডারিন চাইনিজ, তার পরে স্প্যানিস। ইংরেজির অবস্থান তৃতীয়। হিন্দি চতুর্থ আর বাংলার অবস্থান পঞ্চম। সারা বিশ্বে বাংলায় কথা বলে ২৩০ মিলিয়ন মানুষ। বিশ্বের ৪৩ শতাংশ মানুষ দ্বিভাষী বা দুটি ভাষা জানে। ইংরেজি ভাষায় সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ কথা বললেও ৬৬ শতাংশ মানুষ এটিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিক্ষা বা চর্চা করে।
আমরা উচ্চশিক্ষা কিংবা উচ্চতর বিজ্ঞানশিক্ষার কথা যখন বিবেচনা করি, তখন মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষার বিকল্প কিছু ভাবি না। ইংরেজ শাসনের অবসান হয়েছে। তারপর আমাদের ঘাড়ে চাপা পাকিস্তানকেও আমরা হটিয়েছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে আমাদের স্বকীয় ভাষা ও সংস্কৃতির হাত ধরে। আর ভাষা আন্দোলনই বাঙালি হওয়ার সোপান হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের নিজেদের পরিচয়টাকে সুসংহত করেছে। আমরা একটি স্বাধীন দেশের, লাল-সবুজ খচিত পতাকার মালিক হয়েছি। অথচ দুর্ভাগ্য, আমাদের মানসিকতায় বসে থাকা উইপোকার ঢিবিটিকে সরাতে পারিনি।
আমার তিন জন সহকর্মীর সঙ্গে কথা হলো। তিন জনই অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন নিয়েছেন কুড়ি-পঁচিশ বছর হলো। একজন জন্মগ্রহণ করেছেন চীনে। সেখানেই পড়াশোনা করেছেন মাস্টার্স পর্যায় পর্যন্ত। তারপর নিউজিল্যান্ড থেকে ডক্টরেট করে এখন অস্ট্রেলিয়ায়। অন্যজনের জন্ম জার্মানিতে। শুরু থেকে পড়াশোনাও জার্মানিতে। ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিটিউটের ডক্টরেট ও কাজও করেছেন বেশ কিছুদিন সেখানে। তৃতীয় সহকর্মীর জন্ম ও মাস্টার্স পর্যায় পর্যন্ত পড়াশোনা আর্জেন্টিনায়। ডক্টরেট করেছেন অক্সফোর্ড থেকে। তিন সহকর্মীই তাদের মাতৃভাষায় কমপক্ষে মাস্টার্স পর্যায় পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। কথা প্রসঙ্গে তারা বললেন ডক্টরেট ছাড়া প্রতিটি ধাপেই তাদের পাঠ্যপুস্তক ছিল সমৃদ্ধ মাতৃভাষায়। তাদের বিজ্ঞান পেশায় নৈপুণ্য ঈর্ষা করার মতো আর ইংরেজি ভাষায় দক্ষতায় বিস্মিত হতে হয়। তাদের এই দক্ষতা অর্জনে মাতৃভাষা যে কত ভূমিকা পালন করেছে তা বিশ্লষণ করা সহজ না হলেও অনুধাবন করা খুব একটি কঠিন কাজ নয়। আমরা যদি আরো একটু গভীরে যাই, দেখব, পৃথিবীর কল্যাণে যারা সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন নিদেনপক্ষে তাদের জ্ঞান অর্জনের প্রধান মাধ্যমটি ছিল মাতৃভাষা। আর যেটি তাদের ওপরে ওঠার সোপান হিসেবেই কাজ করেছে। দার্শনিক অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে অধুনাকালের এলেইনআস্পেক্ট, শিনিয়াইয়ামানাকা, টুইউইউসহ অসংখ্য কৃতী মানুষের সফলতার পেছনে তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা অর্জন কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। মাতৃভাষা যেমন পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগের সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যময় মাধ্যম, তেমনি জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রেও এটিই সবচেয়ে সহজ মাধ্যম। আর জ্ঞান-বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে গেলে মাতৃভাষার বিকল্প যে নেই তা জার্মান, চীন, ফ্রান্স, ইতালি কিংবা জাপানের দিকে তাকালেই সহজে অনুমান করা যায়।
বাংলা ভাষার অসাধারণ পণ্ডিত ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৮টি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই দেশের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে বাঙালির মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তার বক্তব্য ছিল অত্যন্ত জোরালো। তিনিও আমাদের দেখিয়ে গেছেন মাতৃভাষা শেখার সঙ্গে অন্য ভাষা শেখার কোনো বিবাদ নেই।
মাতৃভাষায় সব পর্যায়ের জ্ঞান অর্জনের অর্থ অন্য ভাষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া নয়। মাতৃভাষায় নিজেকে দক্ষ করার সঙ্গে সঙ্গে কমপক্ষে একটি দ্বিতীয় ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে অপরিসীম। মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষীয় শিক্ষাব্যবস্থা প্রাথমিক পর্যায় থেকে অনেক দেশেই রয়েছে। পাশ্চাত্য দেশগুলোতে কমপক্ষে হাইস্কুল পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রমে একটি দ্বিতীয় ভাষাশিক্ষা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। শিক্ষার্থী চাইলে দ্বিতীয় ভাষাটি উচ্চতর শ্রেণিতেও শিক্ষা কার্যক্রমে সংযুক্ত করতে পারে।
উচ্চশিক্ষায় মাতৃভাষা প্রয়োগে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা স্বীকার না করলেই নয়। আমাদের মাতৃভাষা বিরাগী মনোভাবটিই হলো প্রথম চ্যালেঞ্জ। আর মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষা প্রসারের জন্য দরকার দক্ষ জনশক্তি। জুতসই অনুবাদ এবং দক্ষ ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে পাঠ্যপুস্তক এবং বিষয়বস্তুকে তৈরি করাটাও বড় চ্যালেঞ্জ। দেশকে সমৃদ্ধিশালী করতে হলে জ্ঞানবিজ্ঞানকে সবার মধ্যে সঠিকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। আর এজন্য মাতৃভাষায় আমাদের দক্ষতাকে বাড়াতে হবে। উচ্চশিক্ষায় মাতৃভাষার প্রয়োগকে ফলপ্রসূ করার জন্য সঠিক পরিকল্পনা এবং এর বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।
n লেখক :প্রবাসী কৃষি বিজ্ঞানী
