কয়েকটা লাইন দিয়ে শুরু করা যায়,
‘খুব যদি বিষণ্ন হও
কান্না পায় ক্লান্তির দৌড়ে
তবে এদিকটায় একবার এসো।
ঝাঁপিয়ে পড় ঝরনাধারায়
স্নান নিও সমুদ্রজলে
তাঁবু গেরো ওই সবুজ পাহাড়ে।
কথা দিলাম, জীবন পাবে
নতুন এক জীবন জন্ম নেবে।’
বলছিলাম এমনই একটি জায়গার কথা। চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে অবস্থিত খৈয়াছড়া ঝরনা। আমি এমনিতে খুব ভ্রমণপ্রিয় মানুষ। কোথাও ভ্রমণে গিয়ে প্রকৃতির মধ্যেই যেন জীবন খুঁজে পাই। সেবার সেমিস্টার পরীক্ষা শেষ করেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। কয়েকজন বন্ধু মিলে পরিকল্পনাও করে ফেললাম, জায়গা নির্ধারণ হলো খৈয়াছড়া।
যেহেতু ট্রেইল পার হতে হবে প্রস্তুতিও নিলাম সেভাবেই। ব্যাগ গুছিয়ে রাখলাম রাতেই, খুব সকালেই রওনা দেবো।
ভোর ৫টায় উঠে গেলাম। যেহেতু একদিনের ট্যুর তাই যত সকালে পৌঁছাতে পারি ততোই লাভ, যাচ্ছি কুমিল্লা থেকে। ২৪০ টাকায় টিকেট কেটে সৌদিয়া বাসে উঠি টমছম ব্রিজ থেকে। ঘড়িতে তখন ৬টা ২০। বন্ধুরা মিলে হৈ-হুল্লোড় করে কিছু ছবি তুললাম যাত্রার শুরুতেই। যাত্রা শুরু হলো, বাস এগুচ্ছে দ্রুতগতিতে। ফেনী পার হয়ে প্রবেশ করলাম চট্টগ্রামে। মীরসরাইয়ে বাস পৌঁছালে সবাই নেমে গেলাম। সেখান থেকে সিএনজি করে পৌঁছালাম বরতাকিয়া বাজারে।
বড়তাকিয়া বাজারের উত্তরপার্শ্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪.২ কিলোমিটার পূর্বে ঝরনার অবস্থান। এরমধ্যে ১ কিলোমিটার পথ গাড়িতে যাওয়ার পর বাকি পথ যেতে হয় পায়ে হেঁটে। ২০ মিনিট হাঁটার পর কিছু খাবার হোটেল আর দোকান পেলাম। ভারি ব্যাগ নিয়ে ট্রেইল পার হতে কষ্ট হবে সেটা জেনেই এসেছিলাম। তাই সবাই হোটেলে ব্যাগ জমা রেখে সকালের নাস্তা করে নিই, সময় তখন সকাল ১০টা।
পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ দিয়ে যেতে হবে বলে সবাই একটা করে ছোট মজবুত বাঁশ নিয়ে রওনা হই সামনের দিকে। বাঁশের সাঁকো, ক্ষেতের আইল, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে মন মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হচ্ছিল অনবরত। বেশ খানিকটা কর্দমাক্ত উঁচু-নিচু পথ আর ঝিরিপথ পার হয়ে একটা ছোট ঝরনার দেখা পেলাম। পথের সৌন্দর্যে আমাদের উচ্ছ্বাসের সীমা নেই। ঝিরিপথের হালকা স্রোত আর পিচ্ছিল রাস্তায় সাবধানে পা ফেলে আমরা এগুতে থাকলাম। এবার তুলনামূলক বেশি উঁচু আর খাঁড়া হতে লাগলো রাস্তা। এ রকম কিছুদূর যাওয়ার পর আরেকটা ঝরনা দেখি এবং এবারেরটা আরো সুন্দর। এখানে কিছুক্ষণ থেকে আবার হাঁটা দিলাম পরবর্তী ধাপের লক্ষ্যে এবং এবারের ট্রেকিং সবচেয়ে খাঁড়া আর রিস্কি। বাঁশ হাতে নিয়ে উঠতে লাগলাম সন্তর্পণে। অবশেষে পৌঁছালাম ঝরনার মূল জায়গায়। এই অপার্থিব সৌন্দর্য দেখে যেন সারা গায়ে আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। ঝরনার ওপর থেকে ধাপে ধাপে পানি পড়ছে বিরতিহীন অপূর্ব ছন্দে। ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের আরেক নাম যেন এই খৈয়াছড়া। পরপর ১২টি ঝরনা ক্যাসকেড আকারে সাজিয়ে সৃষ্টিকর্তা যে সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছেন, সেটা নিজের চোখে না দেখলে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
কিছুক্ষণ ঝরনার রূপ দেখে হিম শীতল পানিতে নেমে গেলাম শেষমেশ। মনে হচ্ছিল এখানেই থেকে যাই অনন্তকাল। কিন্তু মনকে এক প্রকার বুঝিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। ওই খাঁড়া, পিচ্ছিল পথ বেয়ে শেষ পর্যন্ত নিরাপদেই ফিরে এসেছিলাম সবাই।
ফেরার পর জামাকাপড় বদলে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিলাম ঝরনা হোটেলে। ক্ষুধা পেটে ভালোই লেগেছিল অতিথিপরায়ণ আপ্যায়ন। ১৩০ টাকায় মুরগির মাংস, আলুভর্তা, ভাত, ডাল!
সাবধানতা সম্পর্কে বলবো
খৈয়াছড়ায় সাধারণ স্যান্ডেল বা স্লিপার নিয়ে যাওয়া উচিত না। ব্যাগ যতটা সম্ভব হালকা রাখতে হবে। বর্ষাকালে প্রচুর পরিমাণে জোঁক থাকায় সতর্কতা আবশ্যক। আর অবশ্যই ময়লা ফেলে আমরাই আমাদের পরিবেশ নষ্ট করবো না। অবশেষে বলবো, অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী মানুষদের জন্য নিঃসন্দেহে এই জায়গাটা হলো স্বর্গরাজ্য।
