১৯৫৯ সালে এহতেশাম পরিচালিত এ দেশ তোমার আমার ছবিতে ছোটখাটো গড়নের জমিদারের নায়েব কানুলালের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের অবাক করে দেন সুভাষ দত্ত। ছবিটি জনপ্রিয় হওয়ায় কৌতুক অভিনেতা হিসেবে সুভাষ দত্ত হিট হন চলচ্চিত্র দর্শকদের কাছে। এরপর রাজধানীর বুকে, হারানো দিন, সূর্যস্নানসহ বেশকিছু ছবিতে কখনো কৌতুক অভিনেতা, কখনো নায়ক চরিত্রে অভিনয় করে পেয়েছেন সুখ্যাতি আর জনপ্রিয়তা। অভিনয়, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র পরিচালনা, কার্টুন আঁকা সব জায়গায় ছিল শিল্পী সুভাষ দত্তের বিচরণ। শুধুমাত্র নিজে শিল্পী হননি, সবসময় তিনি নতুন শিল্পী তৈরির সন্ধান করতেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সুখ দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি চলচ্চিত্রে তুলে ধরে হয়েছেন সব শ্রেণির দর্শকদের প্রিয় পরিচালক। ১৬ নভেম্বর ২০১২ সালে তার জীবনাবসানের পরও তিনি সিক্ত হয়েছেন চলচ্চিত্র দর্শক ও অনুরাগীদের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায়।
সুভাষ দত্তের জন্ম ১৯৩০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের মুন্সিপাড়ায় নানার বাড়িতে। পৈত্রিক বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দি থানার চকরতি গ্রামে। দিনাজপুরের গণেশতলা পাঠশালায় ভর্তি হয়ে লেখাপড়া শুরু করেন তিনি। ক্লাস ফোরে পড়ার সময় শিবাজি নাটকে প্রথম অভিনয় করেন। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার মেজো মামার লেখা ‘পরাজয়’ নাটকের নির্দেশনা দেন। ১৯৪৮ সালে মহারাজা গিরিজানাথ হাই স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ডিবি সিনেমা হলে বড় মামার চাকরির সুবাদে প্রচুর ছবি দেখতেন। কিছুদিন দিনাজপুরের লিলি টকিজে কাজ করেন। এইচএসসি রেজাল্ট ভালো না হওয়ায় কমার্শিয়াল আর্ট শেখার জন্য বোম্বে চলে যান। বন্ধু বিশ্বনাথের সহযোগিতায় ১৯৫১ সালে কামাত আর্ট স্টুডিওতে ৩০ টাকা বেতনে চাকরি নেন। কামাত আর্ট স্টুডিও উদ্বোধন করেন শিল্পাচার্য জয়নূল আবেদিন। সুভাষ দত্ত কামাত স্টুডিওতে আওলাদ, আওয়ারা, গোমস্তা, বাজি, হায়দ্রাবাদ কি নাজনীনসহ বেশকিছু ছবির লেটারিং পাবলিসিটির কাজ করেন। ১৯৫২ সালে পুনরায় দিনাজপুর ফিরে আসেন।
১৯৫৩ সালে সুভাষ দত্ত ঢাকায় এসে চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী ফনিগুহের সহায়তায় এভারগ্রিন পাবলিসিটিতে যোগ দেন। সিনেমার পোস্টার, ব্যানার, প্রেস লে আউট, স্লাইড, হোল্ডিং ও শো-কার্ডের কাজ করেন। কিছুদিন কাজ করার পর শিল্পী কাশেমের সাথে কামার্ট সংস্থা নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এরইমধ্যে কার্টুন আঁকা শুরু করেন। ১৯৫৬ সালে আবদুল জব্বার খানের সাথে পরিচয় ও তার নির্মিত প্রথম মুখ ও মুখোশ ছবির পোস্টার, স্লাইড, বুকলেটের ডিজাইনের কাজ করেন। সত্যজিত্ রায়ের পথের পাঁচালী দেখার পর অনুপ্রাণিত হন ছবি তৈরির জন্য। ছবি তৈরির অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার জন্য মাটির পাহাড় ছবিতে সহকারি শিল্প-নির্দেশকের কাজ করেন। ১৯৫৮ সালে এহতেশাম ছবি পরিচালনা করছেন জেনে পাবলিসিটির কাজ করার জন্য তার সাথে দেখা করতে গেলে এহতেশাম তার পরিচালিত এদেশ তোমার আমার ছবিতে অভিনয় করার প্রস্তাব দিলে রাজি হয়ে যান। ছবিটি হিট হওয়ায় সুভাষ দত্ত দারুণ জনপ্রিয় হয়ে যান। তার জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগানোর জন্য সুতরাং নামে একটি ছবি নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
শচীন ভৌমিকের গল্প নিয়ে সুতরাং ছবির চিত্রনাট্য তৈরি করলেও লেখকের আপত্তির কারণে একই গল্প অনুসরণ করে নতুনভাবে চিত্রনাট্য তৈরি করলেন ছবির জন্য। প্রথমে দিনাজপুরের স্নিগ্ধা চৌধুরী নামে একটি মেয়েকে নায়িকা নির্বাচিত করেন। তবে স্নিগ্ধা চৌধুরীর মায়ের আপত্তির কারণে তাকে ছবিতে নায়িকা করা হয়নি। পরে চট্টগ্রামের মিনা পালকে নির্বাচন করা হয় ছবির নায়িকা হিসেবে। এই মিনা পালই আমাদের চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে খ্যাত চিত্রনায়িকা কবরী। ১৯৬৩ সালে সুতরাং ছবি মুক্তি দিতে নায়িকার বিয়োগান্তক করুণ মৃত্যু দর্শকরা কোনোভাবে মেনে নেবে না বলে ছবির পরিবেশক আনিস দোসানী বাধ সাধলেন। সুভাষ দত্ত ছবির গল্পের ব্যাপারে অনড় থাকেন। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৬৪ সালের ২৪ এপ্রিল। সুপারহিট ব্যবসাসফল হয়। ১৯৬৫ সালে ফ্রাঙ্কফুট আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ছবি, নিগার, ক্রিটিক গিল্ড, স্ক্রিন বিশেষ পুরস্কার লাভ করে সুতরাং ছবি। বাঙালির তত্কালীন সমাজের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন সুতরাং ছবিতে। পরে রোমেনা আফাজের গল্প নিয়ে ১৯৬৬ সালে নির্মাণ করেন কাগজের নৌকা। এ ছবিতে আক্তার হোসেনকে নায়ক ও কোহিনুর আক্তার সুচন্দাকে নায়িকা করেন। ছবিটি ব্যবসাসফল এবং চলচ্চিত্র দর্শক, বোদ্ধাদের কাছে প্রশংসিত হয়। সুতরাং ও কাগজের নৌকা ছবির ব্যাপক সফলতার কারণে নিজেই প্রযোজক সংস্থা শতাব্দি ফিল্মস থেকে নির্মাণ করেন আয়না ও অবশিষ্ট। ১৯৬৭ সালে দুটি গল্প নিয়ে ছবিটি নির্মাণ করেন সুভাষ দত্ত। ১৯৬৯ সালে আয়না ও অবশিষ্ট নিগার মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে পুরস্কার লাভ করে। ১৯৬৮ সালে এক সন্তানহীন নারীর কাহিনি নিয়ে নির্মাণ করেন আবির্ভাব। আবির্ভাব ব্যবসাসফল ও আলোচিত হয়। কম্বোডিয়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে রাণীর বিশেষ পুরস্কার পায় ছবিটি। একই বছর নতুন নায়িকা পল্লবীকে নিয়ে নির্মাণ করেন পালাবদল। আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে ১৯৬৯ সালে পরিচালনা ও প্রযোজনা করেন আলিঙ্গন। আলিঙ্গন ছবিতে নায়ক সুভাষ দত্ত নিজে এবং নায়িকা মন্দিরা। একটি বধির মেয়ের কাহিনি নিয়ে ১৯৭০ সালে পরিচালনা করেন বিনিময়। এ ছবিতে উজ্জ্বলকে প্রথম নায়ক হিসেবে পর্দায় নিয়ে আসেন তিনি। গ্ল্যামারাস নায়িকা কবরীকে দিয়ে বোবা মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করানো এটি ছিল সুভাষ দত্তের আরেকটি দুঃসাহসিকতার পরিচয়। বিনিময় ছবিটি ব্যবসাসফল হওয়ায় দিলারা হাসেমের ঘর মন জানালা উপন্যাস নিয়ে পরিচালনা করে বলাকা মন। এরইমধ্যে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি আর্মিদের হাতে বন্দি হন এবং একজন মেজরের সহায়তায় মুক্তি পান। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে যুদ্ধকালীন নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি অরুণোদ্বয়ের অগ্নিস্বাক্ষী পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত ছবি হিসেবে এটিও প্রশংসিত হয় দর্শকদের কাছে। কিছুটা সত্য ঘটনা নিয়ে ১৯৭৬ সালে পরিচালনা করেন আকাঙ্ক্ষা। ড. আলাউদ্দিন আল আজাদের লেখা ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭৭ সালে পরিচালনা করে বসুন্ধরা। বসুন্ধরা ছবিতে ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথম চলচ্চিত্র নায়ক হন। বসুন্ধরা ছবির জন্য ১৯৭৭ সালে পরিচালক হিসেবে সুভাষ দত্ত প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ ৬টি শাখায় পুরস্কার অর্জন করেন। ড. আশরাফ সিদ্দিকীর গলির ধারে ছেলেটি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন শিশুতোষ চলচ্চিত্র ডুমুরের ফুল। ডুমুরের ফুল দুটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একাধিক বাচসাস পুরস্কার, ১৯৭৯ সালে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে জুরি বোর্ডের বিশেষ পুরস্কার পায়। সুভাষ দত্ত ১৯৬৪ সালে থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত নিজেস্ব চিন্তা চেতনা মেধা দিয়ে স্বাধীনভাবে চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনা করেছেন।
ছোটখাটো হালকা-পাতলা গড়নের মানুষটির মাঝে ছিল অসাধারণ সৃষ্টিশীল ক্ষমতা। চলচ্চিত্রের কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ, শিল্প-নির্দেশনা, মিউজিক, গীত সবকিছুই নিজের মাঝে ধারণ করেছেন। সুভাষ দত্ত ছিলেন চলচ্চিত্রের বিরল এক প্রতিভা। চলচ্চিত্রের পরিবেশ ও তার মতো সৃষ্টিশীল পরিচালকের অনুকূলে ছিল না। ততোদিনে পোশাকি ফ্যান্টাসি ছবির দখলে চলে যায় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি। নিজেকে সমর্পণ করলেন পোশাকি ফ্যান্টাসি ছবি সোহাগ মিলন নির্মাণে। ১৯৮২ সালে সবুজ সাথী ও সকাল সন্ধ্যা নামে দুটি ছবি নির্মাণ করেন সুভাষ দত্ত। শাবানা প্রযোজিত নাজমা (১৯৮৩), স্বামী স্ত্রী (১৯৮৭), পরিচালনা করেন। ববিতার প্রথম প্রযোজিত ছবি ফুলশয্যা (১৯৮৬) ও আগমন (১৯৮৮) নামে দুটি ছবি পরিচালনা করেন তিনি। ষাটের দশকে শবনম অভিনীত অনেক ছবিতে সহ-অভিনেতা হিসেবে কাজ করলেও নায়িকা শবনমকে নিয়ে সহধর্মিণী (১৯৯০) নামে একমাত্র ছবি পরিচালনা করেন। সুভাষ দত্ত কখনোই নিজেকে বাণিজ্যিক ছবির পরিচালক হিসেবে ভাবতে চায়নি। অনেকটা জীবন জীবিকার তাগিদে, নিজেকে কাজের মধ্যে ব্যস্ত রাখার জন্যই তিনি বাণিজ্যিক সফল ছবিগুলো পরিচালনা করেছেন। পরিচ্ছন্ন সামাজিক ছবিগুলোর সাফল্যের কারণে সুভাষ দত্ত নিজের ইচ্ছার পুনরাবৃত্তি ঘটালেন আবদার (১৯৯৩) নামে একটি ছবি প্রযোজনা ও পরিচালনা করে। সুভাষ দত্ত তার কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একুশের পদক, বাচসাস, চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতি কর্তৃক পুরস্কার, চ্যানেল আই কর্তৃক আজীবন সম্মাননাসহ দেশে বিদেশে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ৮৪ বছর বয়সে ২০১২ সালের ১৬ নভেম্বর তার প্রস্থানে দর্শক, চলচ্চিত্র বোদ্ধা, সমালোচক, লেখক সবাই হয়েছেন শোকাহত।
লেখক :চলচ্চিত্র গবেষক, লেখক ও শিক্ষক

