বেকারত্ব ও রাষ্ট্রের দায়

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:৫০

সাধন সরকার

করোনা মহামারি তরুণদের জীবনে মহাসংকট নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে সেশনজট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আবার দীর্ঘদিন ধরে চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধ থাকায় বেকারত্ব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বন্ধ থাকায় লাখ লাখ বেকার তরুণ চাকরিতে আবেদনের তথা যোগদানের বয়স হারিয়েছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবে চাকরিতে যোগদানের বয়স বাড়ার দীর্ঘদিনের দাবি করোনাকালে আরো জোরালো হয়েছে। করোনাকালের পরিবর্তিত বাস্তবতা উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সেশনজটের সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে! জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা আটকে থাকার পর স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষা শুরু হয়েছে মাত্র। যদিও এর মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব পরীক্ষা বাকি আছে সেসব পরীক্ষা শেষ করতেও চলতি বছর পার হয়ে যাবে! সময় চলে যাচ্ছে, বয়স বাড়ছে। করোনাকালে কত-শত বেকার চাকরিপ্রত্যাশীর জীবন থেকে চাকরিতে আবেদনের বয়স শেষ হয়ে গেছে তার হিসাব কে রাখে! একজন চাকরিপ্রত্যাশী বেকারের জীবনে চাকরির আবেদনের বয়স পার হওয়ার শেষ দিনগুলো যে কত গুরুত্বপূর্ণ, ভুক্তভোগীই শুধু তা বোঝে। করোনা মহামারি মানুষের জীবন-জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। তবে চাকরিপ্রত্যাশী বেকার তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। করোনার পরিসমাপ্তি কবে ঘটবে তাও নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। বর্তমান  প্রেক্ষাপটে বেকার তরুণদের চাকরির বয়স শেষ হওয়া ও সম্ভাব্য সেশনজটের কথা চিন্তা করে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো সময়ের দাবি। শুধু করোনাকাল বলেই নয়, চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে চাকরিতে প্রবেশের বয়স যৌক্তিকভাবে বাড়ানোর আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল।

চাকরিতে যোগদানের বয়সসীমা বাড়ানো হয়েছিল সর্বশেষ ১৯৯১ সালে। তখন চাকরিতে যোগদানের বয়স ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয়েছিল। যদিও তখন গড় আয়ু ছিল ৪৫ বছর। অতঃপর প্রায় ৩০ বছর পার হতে চলল। গড় আয়ুও এখন বেড়ে হয়েছে ৭২ বছর। মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় সবকিছুতেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিত্সা, ব্যবসা, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, গড় আয়ু ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এমনকি অবসরের বয়সসীমাও বেড়েছে। কিন্তু চাকরিতে প্রবেশের বয়স আর বাড়ানো হয়নি। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বছরের পর বছর শুধু বেড়েই চলেছে। প্রত্যেক বছর গেল বছরের চেয়ে বেশি চাকরিপ্রার্থী বাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু চাকরির ক্ষেত্র ও পদসংখ্যা সীমিত হওয়ায় চাকরির প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চাকরি পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ১৬০টিরও বেশি দেশে এখন চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০-এর অধিক। বাস্তবতা এটাই যে, এদেশে বর্তমানে লাখ লাখ ছেলেমেয়ের উচ্চশিক্ষা আছে, সনদ আছে কিন্তু চাকরি নেই। বয়স ৩০ পার হওয়া মানে যেন অর্জিত সার্টিফিকেটের মেয়াদ শেষ!

বর্তমানে ৩০ লাখের বেশি কর্মক্ষম তরুণ-তরুণী বেকার। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের তুলনায় সর্বাধিক। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০-এ বেঁধে রাখার ফলে সব শিক্ষার্থীর মেধা কি আদৌ কাজে লাগানো যাচ্ছে? চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো হলে যে যার দক্ষতা অনুযায়ী চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমার ওপর নয়, উন্নত দেশসমূহ দক্ষতার ওপর সবচেয়ে জোর দিয়ে থাকে। করোনায় স্থবির হয়ে যাওয়া জীবনব্যবস্থায় সরকার অনেক সেক্টরে প্রণোদনাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ঘোষণা করেছে। উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সম্ভাব্য সেশনজটের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া, করোনাকালে লাখ লাখ চাকরিপ্রত্যাশী বেকার তরুণের চাকরির বয়স বিবেচনা ও দীর্ঘদিনের যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষাপটে এখনই চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ বছর করা দরকার। বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ালে ক্ষতির সম্ভাবনা নেই, বরং সব পর্যায়ের তারুণ্যের মেধা কাজে লাগালে দেশ এগিয়ে যাবে, বেকারত্ব কমবে।

ঢাকা