করোনার প্রভাবে ঋণগ্রস্ত নিম্ন আয়ের মানুষ

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:১৫

৫০ শতাংশ গৃহকর্মী এখনো বেকার

মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ

রাজধানীর শ্যামলী কাজি অফিসের পেছনে ৪ হাজার টাকা ভাড়ায় থাকেন গৃহকর্মী পারভীন বেগম। করোনার আগে তার মাসে আয় ছিল ১২ হাজার টাকা। সে সময় কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রামে চলে যান তিনি। সুদের ওপর টাকা নিয়ে গ্রামে দুই সন্তান নিয়ে চলছিল তার সংসার। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ঋণের টাকা শোধ করতে ফিরে আসেন রাজধানীতে। কিন্তু আগের মতো আর কাজ মেলে না পারভীনের। এখন ঢাকা শহরে তার কর্মস্থলে মাস শেষ হওয়ার আগেই অগ্রিম টাকা নিয়ে চলছে তার সংসার। পারভীন বলেন, ‘প্রতিমাসে ধারদেনা করে চলতে হয়, আগের মতো কাজও নেই। গ্রামে ঋণের টাকার কিস্তি পাঠাতে হয়। এমন মানসিক বিপর্যয় নিয়ে কাজ করতে আর ভালো লাগে না। এরমধ্যে ছোট পোলাটারে ভালো-মন্দ খাইতে দিতে পারি না। অসুখ-বিসুখ তার লেগেই থাকে, ডাক্তারও দেখাইতে পারি না, ট্যাকার অভাবে।’

পারভীনের মতো এমন গল্প এখন প্রতিটি নিম্ন আয়ের মানুষের। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজন বলছেন, করোনায় নিম্ন আয়ের মানুষ অভাব আর নানা সংকটে পড়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। করোনা মহামারির পরে বস্তিবাসীরা হাজারটা সমস্যার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন। তাদের আগের মতো আয় নেই, ঘরে তিন বেলার খাবার নেই, অসুখে-বিসুখে ওষুধ কেনার বা চিকিত্সা নেওয়ার টাকা নেই। সরকার চেষ্টা করে গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

২০২০ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বেসরকারি সংগঠন ‘বারসিক’ এর গবেষণায় দেখা গেছে, করোনার কারণে এখন পর্যন্ত ৫০ শতাংশ গৃহকর্মী এখনো তাদের কাজ ফিরে পায়নি। যারা কাজ করছে, তারা আগে তিনটি বা চারটি কাজ করলেও এখন করছে মাত্র একটি বা দুটি। ফলে শুধু গৃহকর্মীদের আয় কমেছে ৬৬ ভাগ। যার প্রভাব পড়েছে তাদের খাদ্যাভ্যাসসহ অন্যান্য জীবনযাত্রায়। ৮৫ ভাগ বস্তিবাসী মানুষ ৫ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকার ঋণে জর্জরিত।

বেসরকারি তথ্য মতে মোট বস্তিবাসীর সংখ্যা ৪০ লাখের অধিক, যা ঢাকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এই মানুষগুলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা, খরা, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, শৈত্যপ্রবাহ, লবণাক্ততার কারণে জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে শহরে ভিড় করছে। ফলে সহজলভ্যতার কারণে তাদের অধিকাংশেরই জায়গা হচ্ছে শহরের অপরিকল্পিত এবং অপরিচ্ছন্ন বস্তিতে ও ফুটপাতের খোলা জায়গায়। তাছাড়াও গ্রাম এবং শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য তাদের শহরে আসতে বাধ্য করছে।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) তথ্য মতে, করোনাকালে পারিবারিক খরচ চালাতে না পেরে ঢাকা শহর ছেড়ে ১৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ মানুষ গ্রামে চলে গিয়েছিলেন এবং রিকশাচালকদের আয় কমেছে ৫৩ শতাংশ। এর মধ্যে নগরে সরকারের নগদ সহায়তা পেয়েছেন ১৬ শতাংশ মানুষ। করোনার ঐ নিদানকালে নগরের এই বিরাট দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে যে কোনোভাবেই হোক বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

সরকার ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য প্রায় ৯৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। অন্য খাতের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যে ১৪৫টির মতো সেবা খাত-উপ খাত রয়েছে, সেখানে নগরের নিম্ন আয়ের মানুষদের যুক্ত করতে পারলে তাদের জীবনজীবিকা কিছুটা হলেও সচল হতে পারত বলে বস্তিবাসীরা মনে করেন।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আব্দুস সোবহান বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষদের তাদের স্ব স্ব কাজে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। নগরের নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য গ্রামের মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করতে হবে। তাদের ঋণ মওকুফের ব্যবস্থা করতে হবে। শহরের নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। করোনায় কর্মহীন নিম্ন আয়ের বস্তিবাসী ও পথবাসী মানুষদের জন্য আয়বর্ধনমূলক কাজের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং নগরের বস্তি উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে। বস্তিবাসীদের জন্য সরকারি উদ্যোগে আবাসন ব্যবস্থা করাসহ বস্তিবাসীদের জন্য রেশনিংয়ের ব্যবস্থার করা প্রয়োজন।