মুশতাকের মৃত্যুতে শাহবাগে দিনভর বিক্ষোভ, সন্ধ্যায় পুলিশের ধাওয়া

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:৪২

কাশিমপুর কারাগারে লেখক মুশতাকের মৃত্যুর প্রতিবাদে গতকাল রাজধানীর শাহবাগে দিনভর বিক্ষোভ কর্মসূচির পর সন্ধ্যায় আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের কয়েক জন আহত হয়। 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যা ৬টায় আন্দোলনকারীরা মশাল মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে যান। পথে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে পুলিশ বাধা দিলে আন্দোলনকারী ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এদিকে হামলার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দফায় দফায় মিছিল করে আন্দোলকারীরা।  আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাদের তিন জন আহত হয় ও বেশ কয়েক জনকে আটক করে পুলিশ। অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে ১০-১২ জন আহত হয় বলে জানানো হয়।

হামলার বিষয়ে প্রগতিশীল ছাত্র জোটের সমন্বয়ক আল কাদেরী জয় বলেন, আমরা যখন পাবলিক লাইব্রেরির সামনে যাই, তখন পুলিশ আমাদের বাধা দেয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ ঘটনায় নারী কর্মীদের লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ তার। এ বিষয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাশেদ শাহরিয়ার জানান, হামলার প্রতিবাদে ও মৃত্যুর বিচারের দাবিতে আজ ১২টায় রাজু ভাস্কর্য    থেকে বিক্ষোভ মিছিল করবেন আন্দোলনকারীরা।

এ বিষয়ে পুলিশের রমনা জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) সাজ্জাদুর রহমান বলেন, পুলিশ তাদের ওপরে হামলা করেনি। আন্দোলনকারীদের হামলায় পুলিশের ১০ থেকে ১২ জন সদস্য আহত হয়েছে। আন্দোলনকারীদের নিক্ষেপ করা ইটপাটকেলে তিনি নিজেই আহত হয়েছেন।

কাশিমপুর কারাগারে বৃহস্পতিবার রাতে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে রাতেই বিক্ষোভ মিছিল করেছে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো। তারা ডিজিটাল আইন বাতিলের দাবি জানান। সেখান থেকে ঘোষণা আসে, সকালের বিক্ষোভ কর্মসূচির। গতকাল শুক্রবার দিনভর রাজধানীর শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দফায় দফায় বিক্ষোভ হয়েছে। বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি নুরুল হকের সংগঠন এসব কর্মসূচি পালন করে। বেলা ৩টায় শাহবাগে মুশতাকের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দিনের কর্মসূচির পর সন্ধ্যায় ‘মুশতাকের হত্যার প্রতিবাদে’ মশাল মিছিলের আয়োজন করা হয়।

সকাল ১০টা থেকে শাহবাগে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে প্রগতিশীল ছাত্র জোটসহ সহযোগী সংগঠনগুলো। বিক্ষোভে ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স বলেন, করোনার ১১ মাসে দেশে যে মহালুটপাট ও দুর্নীতি হয়েছিল তার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন লেখক মুশতাক। এই সরকার এতই অসহিষ্ণু, তার মসনদ এতই দুর্বল যে, এই ন্যূনতম সমালোচনাও সহ্য করতে পারেনি। এ সরকারের বিরুদ্ধে যেই সমালোচনা করবে তাকেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ঠেলে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় দমন-নিপীড়নের উত্কৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে লেখক মুশতাক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

প্রিন্স আরো বলেন, ‘আজ কার্টুনিস্ট কিশোরও অসুস্থ অবস্থায় টানা ৯ মাস কারাগারে আছেন। সরকারের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ধিক্কার জানাই এবং সেসঙ্গে ফ্যাসিবাদি ?ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। আসুন ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলি।’

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল কাদেরী জয় বলেন, ‘যে সমাজে কথা বলার মতো কেউ থাকে না, সে সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে মেরুদণ্ড ভাঙার সে আয়োজন চলছে। তারই ধারাবাহিকতায় লেখক মুশতাক হত্যাকাণ্ড।’

ফ্রন্টের ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক রাজীব কান্তি রায় বলেন, ‘এটা কোনো সাধারণ মৃত্যু নয়। এটা একটা রাষ্ট্রীয় খুন। এর মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সরকার একটা ভীতি তৈরি করতে চায়। কিন্তু আমরা সরকারের এই চেষ্টা সফল হতে দেব না।’

ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জাহিদ সুজন বলেন, ‘এই হত্যায় আমাদের হূদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। আপনার কথা বলার অধিকার যদি কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে আপনি যে মানুষ সেটাও অস্বীকার করা হয়। এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ মানুষ বন্দি রয়েছে। আর কত! আর কত মানুষ মরলে আমরা জাগব’।

গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সভাপতি আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, ‘আজ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নেই বললে চলে। নিশ্চিতভাবে বলতে পারি রাষ্ট্র এই লেখককে হত্যা করেছে। তার দোষ ছিল সে যুক্তিক বিষয়ে লেখালেখি করত। এভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তার আইনে আর কত মানুষকে হত্যা করা হবে, গ্রেফতার করা হবে! ’

বিকালে গায়েবানা জানাজা

বিকালে মুশতাক আহমেদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। নুরুল হক নুরের সংগঠন ছাত্র অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে এ গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী উপস্থিত ছিলেন। সেখান থেকে আগামী ৩ মার্চ প্রেসক্লাবে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেন জোনায়েদ সাকী। সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে রওয়ানার কথা জানান তিনি। জানাজা শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহিদ মিনার এলাকায় যায় নুরের নেতৃত্বের মিছিলটি। শহিদ মিনারে এক সমাবেশে নুরুল হক নুর বলেন, যারাই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলছে তাদের কখনো হাতুড়ি দিয়ে, হেলমেট দিয়ে, কখনো ছাত্রলীগ দিয়ে নিপীড়ন চালানো হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রভাব

এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রিয়াজ তার ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, ‘... মুশতাক কীভাবে মারা গেছেন তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে তিনি রাষ্ট্রের হেফাজতে ছিলেন, তার দায়িত্ব নিয়েছিল সরকার—এই মৃত্যুর দায়-হত্যার দায় সরকারের...।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক লিখেছেন, ‘মুশতাক জেলে মারা গেছেন। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে তাকে জেলে পাঠানো হয়েছিল। তার অপরাধ ছিল লেখালেখি করা, অন্য কিছু নয়।’

সন্ধ্যায় মশাল মিছিল

এদিকে সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মশাল মিছিল করেন আন্দোলনকারীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র এলাকা থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাজু ভাস্কর্যে এসে শেষ হয়। সেখান থেকে আজ শনিবার বেলা ১১টায় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেন তারা।

সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মুশতাকের হত্যাকারী : জাফরুল্ল­াহ

গতকাল বিকালে শাহবাগে লেখক মুশতাক আহমেদের গায়েবানা জানাজা পূর্ববর্তী সমাবেশে গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্ল­াহ চৌধুরী বলেছেন, ‘লেখক মুশতাককে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীদের খোঁজ কী পাওয়া যায়নি? পাওয়া গেছে। তার হত্যাকারী হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। আর এ আইন হলো সরকারি বাহিনীর একটি অধ্যাদেশ। এই সিকিউরিটি আইনের সঙ্গে যারা জড়িত তারা প্রত্যেকে এই হত্যার সঙ্গেও জড়িত।’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সমালোচনা করে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আরো বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন নাগরিকের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন দিয়ে কোনো সরকার টিকে থাকতে পারে না।