চিকিত্সকের বাসায় নির্যাতিত বরিশালের শিশু গৃহকর্মী হাসপাতাল থেকে ‘উধাও’

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:৫৫

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার হারতা ইউনিয়নের জামবাড়ি গ্রামের শিশু নিপা বাড়ৈ (১১) দুর্ভাগ্যজনক এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। মানসিক ভারসাম্যহীন স্বামীসহ তিন সন্তানকে ফেলে মা আরেক বিয়ে করেছে তিন বছর পূর্বে। সেই থেকে অতি কষ্টে দিন কাটছিল তিন ভাইবোনের। অভাবের তাড়নায় ছয় মাস আগে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে নিকটাত্মীয়রা ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালের রেজিস্টার ডা. সি এইচ রবিনের শ্যামলীর বাসায় নিপাকে কাজে দেয়।

অভিযোগ উঠেছে, কাজে যোগদানের পর থেকেই রবিনের স্ত্রীর নির্যাতনের শিকার হয়েছে শিশুটি। নির্যাতনে গুরুতর জখম অবস্থায় ২৩ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রামের বাড়ির সামনের রাস্তায় ফেলে রাখা হয় এবং উজিরপুর থানা পুলিশের মাধ্যমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সা দেওয়া হয়। কিন্তু ফের অর্থলোভীদের লোভের শিকার হতে হয়েছে ঐ শিশুটিকে। ২ নম্বর হারতা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার নরেন্দ নাথ বাড়ৈর মধ্যস্থতায় চিকিত্সক দম্পতি বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য নানা লোভ দেখাচ্ছেন এমন অভিযোগ উঠেছে। লোভে পড়ে শিশুটির চাচা তপন বাড়ৈ ও চাচি মুক্তি বাড়ৈ অসুস্থ শিশুকে বার বার হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য চিকিত্সকের কাছে ধরনা দেন। চিকিত্সা চলমান থাকায় চিকিত্সকরা তাকে হাসপাতাল ত্যাগে অনুমতি না দেওয়ায় মেম্বার নরেন্দ নাথ বাড়ৈ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গভীর রাতে আলোচনায় বসেন। তাতে কোনো ফল না হওয়ায় বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে নিখোঁজ শিশুটি। গতকাল শুক্রবার রাত ৮টা পর্যন্ত সে কোথায় আছে তা জানাতে পারেনি থানা পুলিশ কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শওকত আলী ইত্তেফাককে জানান, শিশুটিকে ভর্তির পর থেকেই নানা মহল থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য লোকজন আসে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে একজন ইউপি মেম্বারের নেতৃত্বে কিছু লোকজন শিশুটিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এলে তিনি পুলিশের অনুমতির কথা বলেন। কিন্তু ভোর থেকে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডা. সামসুদ্দোহা উজিরপুর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।

উজিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিয়াউল আহসান বলেন, ভর্তির পর থেকে তার চাচা-চাচি দেখাশোনা করার জন্য ছিলেন এবং এ ব্যাপারে আইনানুগ প্রক্রিয়া চলছিল। তিনি বলেন, শিশুটিকে উদ্ধার করা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন জানান, তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ। অন্যদিকে, উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রণতি বিশ্বাস জানান, পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ করে শিশুটির জন্য যা যা করণীয় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা করা হবে।

এদিকে, সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বরিশাল জেলা সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে শিশুটিকে উদ্ধার করে তার সঠিক চিকিত্সা প্রদানসহ পরিবারের অপর সদস্যদের সহায়তার দাবি জানান। তিনি বলেন, অনেকেই শিশুটির এ অবস্থার কথা শুনে তার পরিবারকে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অথচ অসাধু লোকজন তাকে নিয়ে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা চালাচ্ছে।

এদিকে স্থানীয় একাধিক সূত্রের মাধ্যমে জানা গেছে, মেম্বার নরেন্দ নাথ বাড়ৈ নির্যাতিত শিশুটির পক্ষ হয়ে ডাক্তার দম্পতির কাছে দেন-দরবারের এক পর্যায়ে গভীর রাতে ৫ লাখ টাকায় রফা হয়। সাংবাদিকরা শিশুটির গ্রামের বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি জানার চেষ্টা করলে নিপার দাদি সুর বাড়ৈ (৬০) উত্তেজিত হয়ে বলেন, এ বিষয়টি মিমাংসা হয়ে গেছে। কে মিমাংসা করেছে কীভাবে করেছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সবাই মিমাংসা করেছে। নিপার বড় বোন জয়ন্তী বাড়ৈ বলে, তার বোন সুস্থ হয়েছে এবং তাকে বাড়ি নিয়ে আসা হচ্ছে বলে চাচা-চাচি পার্শ্ববর্তী বাড়িতে ফোন করে তাকে জানিয়েছেন। তাই সে বোনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ সময় স্থানীয় কয়েক জন এসে জানান, নরেন্দ নাথ বাড়ৈ তাদের পাঠিয়েছেন এবং এ বিষয়ে কাউকে কোনো কথা বলতে বারণ করেছেন এবং আপনাদের (সাংবাদিকদের) চলে যেতে বলেছেন।

বিষয়টি জানার জন্য, নরেন্দ নাথ বাড়ৈকে ফোন করা হলে তিনি জানান, একটি অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকায় দেখা করতে পারবেন না। শিশুটিকে রাতে আনতে যাওয়া এবং মধ্যস্থতা করার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে দাবি করেন, তার উদ্যোগেই নিপাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।