সফলতা ও সুখের চিরন্তন রহস্যের সন্ধানে

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:১২

ড. মোঃ নাছিম আখতার

জীবনের সফলতা ও সুখ সবারই কাম্য। তাই সারাজীবন ধরে আমরা সকলেই সফল ও সুখী হওয়ার উপায় খুঁজে ফিরি। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। সবসময় খুঁজছি সফল ও সুখী জীবনের সরল সমীকরণ। পড়াশোনা লব্ধজ্ঞান, চারপাশের বিদ্যমান দৃষ্টান্ত এবং নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সফলতার মূল রহস্য অনুসন্ধানের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।

ইতিহাসের পাতায় রয়েছে বহু সফল মানুষের জীবন কাহিনি। তাদের জীবনাদর্শ পাঠ করলে তাদের চরিত্রে তিনটি মানবীয় গুণ প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হয়— ভক্তি, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতাবোধ। ছেলেবেলায় মুসলিম সাধক বায়েজিদ বোস্তামিকে নিয়ে লেখা পড়েছি। তাঁর চরিত্রে ভক্তি, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতাবোধের মেলবন্ধন ঘটেছিল। বাল্যকালে একদা তিনি মায়ের শিয়রে পানি নিয়ে সারারাত দাঁড়িয়ে ছিলেন। সে কাহিনি  প্রায় সবারই জানা।

বরেণ্য বাঙালি পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর জ্ঞানের জন্য বিদ্যাসাগর উপাধিতে ভূষিত হন। সারাজীবন তিনি তাঁর নীতিতে ছিলেন অবিচল এবং অটল। তখনকার কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের বহু কুপ্রথা তিনি সংস্কার করেন। সমাজের অন্যায় এবং অনাচারের বিরুদ্ধে তার ছিল দৃঢ় নৈতিক অবস্থান। তার এই মানসিক শক্তির শেকড় খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়— মা, মাটি এবং মানুষ এই তিনটির উপর ছিল তার অগাধ ভক্তি, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতাবোধ। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ নদী সাঁতরে তাঁর মায়ের কাছে পৌঁছানোর কথা কে না জানে!

বিশ্বখ্যাত কবি সাহিত্যিকগণ যারা প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে আছেন তারা দেশ ও মানুষের প্রতি ছিলেন গভীরভাবে দায়বদ্ধ। কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি..” কবিতায় দেশমাতৃকার যে বন্দনা রচিত হয়েছে তা দেশের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসারই নিদর্শন মাত্র। এ ধরনের দৃষ্টান্তে ভরে বঙ্গের সাহিত্যভা্লার।

গবেষণাকে ভালোবাসতেন বলে স্যার আইজ্যাক নিউটন বহু বছরের গবেষণা ও নিবন্ধ তার পোষা কুকুর মোমবাতির আগুন ফেলে পুড়িয়ে দেয়ার পরেও হতোদ্যম হননি। তিনি পূর্ণ ধৈর্য সহকারে আবার গবেষণা নিবন্ধগুলি লিখেছিলেন। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন বারো বছর বয়সে জীবন-যুদ্ধে নামতে বাধ্য হন। পোর্ট হেরন থেকে ডেট্রয়েটের মধ্যে প্রতিদিন চলাচলকারী ট্রেনে তিনি খাবার ও পত্রিকা বিক্রি করতেন। ডেট্রয়েটে ট্রেনটি অনেকক্ষণ অবস্থান করতো। সে সময় তিনি সেখানকার একটি লাইব্রেরিতে বসতেন এবং বই পড়তেন। এইভাবে তিনি ঐ লাইব্রেরির সমস্ত বই পড়ে শেষ করেছিলেন। তার  প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মূলে রয়েছে বইয়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। স্যামুয়েল হ্যানিম্যান ছিলেন একজন খ্যাতনামা জার্মান চিকিত্সক। হোমিওপ্যাথি চিকিত্সার আবিষ্কারের সময় সতীর্থদের কাছ থেকে তাকে বহু অপমান সহ্য করতে হয়েছে। একারণে তিনি হাজতবাসও করেছেন। কিন্তু মানবতার প্রতি ছিল তার প্রগাঢ় ভালোবাসা। তাই তিনি তার কাজ থেকে এক চুলও বিচ্যুত হননি।

আসা যাক সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে। সম্প্রতি নিজের মেয়ের বিয়েতে ৭০০ কোটি টাকা ব্যয় করে আলোচিত হয়েছেন ভারতের শ্রেষ্ঠ ধনী মুকেশ আম্বানি। খ্যাতিমান এই শিল্পপতি প্রতিদিন কীভাবে সময় কাটান, তা নিয়ে মানুষের অনেক আগ্রহ রয়েছে। মুকেশ আম্বানি কিভাবে দিন কাটান বা তার প্রতিদিনের কর্মতালিকায় কী  কী  বিষয় থাকে, তা নিয়ে সম্প্রতি সংবাদ প্রকাশ করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম। খবরে প্রকাশ, অফিসে যাওয়ার সব প্রস্তুতি শেষ করে ১০টা ১০ মিনিটের দিকে তিনি চলে যান মায়ের কাছে। মায়ের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিয়ে ঘর ছাড়েন তিনি। অন্য কোনো কাজ বাদ পড়লেও এই কাজটি কখনো বাদ পড়তে দেন না তিনি। তার প্রাত্যহিক জীবনের এই অবিচ্ছেদ্য কর্মটি ভক্তি, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতার মহামিলন। এখানে দেখা যাচ্ছে যুগের পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু জীবনের সফলতা ও সুখ অর্জনের মূলের বিষয়গুলো একই রয়ে গেছে।

বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে রয়েছে হতাশা এবং উদ্যমহীনতা। এই হতোদ্যম নতুন প্রজন্মকে জাগিয়ে তোলার জন্য দরকার সফল ও সুখী জীবনের রহস্য উন্মোচন। কেবল গুরুজনদের প্রতি ভক্তি, ভালোবাসা দেখালে চলবে না, ধারণ করতে হবে হূদয়ে। তাছাড়া এই মানবীয় গুণাবলিগুলো জীবন গড়ার প্রত্যেকটি কর্মকাণ্ডের মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে হবে। তবেই আসবে সার্বিক সার্থকতা ও সফলতা।

ইতিবাচক ভাবনা ও কর্মকাণ্ড মানুষের মধ্যে শুভশক্তির জন্ম দেয়। এই শুভশক্তির প্রভাবেই যেকোনো উদ্যোগ সফলতায় পর্যবসিত হয়। সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গেছে যারা ইতিবাচক চিন্তা করেন তারা দীর্ঘজীবী হন। ইতিবাচক ভাবনার শক্তি আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতাকে সঠিক দিকে পরিচালিত করে। তখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সুযোগও সফলতায় পরিবর্তিত হয়। ভালো কাজ সম্পাদনে বাধা-বিপত্তি আসতে পারে। এসব কিছু আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। যদি আমাদের কাছে থাকে সবচাইতে বড় শক্তি ‘পাওয়ার অফ পজিটিভ থিংকিং’। এটি একটি অদৃশ্য ধনভাণ্ডার। যার পরশে মানুষ জীবনে সফল ও সুখী হতে পারে।

n লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর