শীতার্তদের পাশে দাঁড়ানো ঈমানী কর্তব্য

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:১৪

রাসূলুল্লাহ (স) বলেন- ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে দুনিয়াতে ছাড় দিবে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে ছাড় দিবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ লুকিয়ে রাখবেন

   হাফেজ মাওলানা কাজী মারুফ বিল্লাহ্

 

আল্লাহ তা’আলার অপার সন্তুষ্টি লাভ করতে হলে সর্বপ্রথম সৃষ্টির সেরাজীব মানুষকে ভালবাসতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে ‘খিদমতে খল্ক’- সৃষ্টির সেবার প্রাথমিক কাজ হচ্ছে জনকল্যাণ ও মানবসেবা।  অন্নহীনকে অন্নদান, বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান, গৃহহীনকে আশ্রয়দান, নিরক্ষরকে শিক্ষাদান, অসুস্থকে সেবাদান, অসহায় বিত্তহীনকে অর্থদান, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় বিপদ আপদে পতিত দুঃস্থ মানুষকে প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতা করা প্রত্যেক ঈমানদারের ঈমানী কর্তব্য। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা সূরা যারিয়াতের ১৯ তম আয়াতে ইরশাদ ফারমান— ‘তোমাদের ধন-সম্পদে বঞ্চিত ও প্রার্থীদের হক রয়েছে।’

বুখারী শরীফে এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন- ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে দুনিয়াতে ছাড় দিবে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে ছাড় দিবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ লুকিয়ে রাখবেন। আর আল্লাহ বান্দার সাহায্যে ততক্ষণ থাকবেন যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকবে।’

মহান আল্লাহর ইচ্ছায় প্রকৃতির অমোঘ বিধানে ঋতুর পরিবর্তন হয়ে থাকে। বর্তমানে আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ চলছে। খেটে খাওয়া দিনমজুরে মানুষগুলো হাড়ভাঙা শীতে কাঁপছে। অনেকে না পারছেন ঠিকমতো আহার যোগাড় করতে আর না পারছেন শীতের বস্ত্র কিনতে। তাই আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানো কেবল মানবিক দায়িত্বই নয়; এটা পুণ্যের কাজও বটে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা সূরা বাক্বারার ১৭৭ তম আয়াতে ইরশাদ ফরমান— ‘কোনো পুণ্য নেই পূর্ব এবং পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোতে; কিন্তু পুণ্য আছে কেউ ঈমান আনলে আল্লাহর উপর, আখেরাতের উপর, ফেরেশতাদের উপর, সকল কিতাবের উপর, আর সকল নবী রাসূলদের উপর এবং অর্থ দান করলে আল্লাহর প্রেমে আত্মীয়-স্বজন, এতীম, মিসকীন, মুসাফির, সাহায্যপ্রাথী এবং দাস মুক্তির জন্য।’ আমরা এই আয়াতেকারীমার মাধ্যমে জানতে পাচ্ছি- কেবল সালাত আদায়, সিয়াম সাধনা, হজ্ব পালন, যিকির-আসকার, তাসবীহ-তাহলীলই ইবাদত নয়; মানবসেবাও বড় একটি ইবাদত।

প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ মানুষের পারস্পরিক মানবতাবোধ এবং উদার মানসিকতা থাকতে হবে। একজন মানুষ বিপদে পড়লে, অসহায় হয়ে পড়লে, সমাজের অন্য দশজন যেন তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় এটাই মানবপ্রেম। কোনো ধর্ম, বর্ণ, জাত, কুল বা বংশ নয়, মানুষ নামের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে হূদয় প্রাণ দিয়ে ভালোবাসা যায়, তার সেবা করা যায় এটাই ইসলাম, ইসলামের নবী সে শিক্ষাই দিয়ে গেছেন।

আজ যেসব ছিন্নমূল, খেটে খাওয়া অসহায় মানুষগুলো শীতে কষ্ট পাচ্ছে, সবাই মিলে আমাদেরকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা তাদেরকে কম্বল বা গরম কাপড় কিনে দিতে পারেন; আর যাদের নতুন কাপড় কিনে দেবার সামর্থ্য নেই তারা ঘরের পুরাতন কাপড়টি ধুয়ে ঐসব অসহায় মানুষগুলোকে দিলে তাদের কাছে এটা নতুন বলে মনে হবে। প্রত্যেকটা দুর্যোগে সম্মিলিতভাবে আমাদেরকে কাজ করতে হবে। যুব সমাজ, মসজিদের ইমাম ও খতীবগণ এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। আমাদের প্রিয় নবী সা. আর্তমানবতার সেবার জন্য যুবক বয়সে যেভাবে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক সংগঠন করে পুরো আরববাসীকে সেবা দান করেছিলেন, তেমনিভাবে আমাদেরকেও ব্যক্তি থেকে সাংগঠনিক পর্যায়ে মানুষের সেবা করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টির সেবার মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমীন!

lলেখক :ধর্মীয় আলোচক, উপস্থাপক ও খতীব জাজিরা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা