হাওর উন্নয়নে দীর্ঘসূত্রতা কাম্য নহে

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২১, ২১:৪৫

আমাদের দেশে খাদ্য উত্পাদনে হাওরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই হাওর জনপদ বরাবরই অবহেলিত হইয়া আসিতেছে। যদিও ২০১০ সালে সরকার ‘জাতীয় হাওর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা’ প্রণয়ন ও অনুমোদন করিয়াছে এবং হাওরের উন্নয়ন লইয়া যাহা যাহা করা প্রয়োজন তাহার উল্লেখযোগ্য অংশ এই মহাপরিকল্পনায় স্থান পাইয়াছে বটে, কিন্তু অদ্যাবধি শিক্ষা, চিকিত্সা, যোগাযোগ, অবকাঠামো—বলিতে গেলে সকল দিক হইতেই হাওর অঞ্চল পিছাইয়া রহিয়াছে।

এই উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা টেকসই না হইলে এবং তাহা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় শম্বুকগতিতে চলিলে প্রত্যাশিত উন্নয়নচিত্রের দেখা মিলিবে না। একটি উদাহরণ দেওয়া যাইতে পারে। হাওর ও চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও কষ্ট লাঘবের জন্য ২০১৮ সালের ২২ জুলাই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ক্যাম্পাসে হাওর ও চর উন্নয়ন ইনস্টিটিউট উদ্বোধন করিয়াছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। কিন্তু ৩১ মাস পার হইলেও ইনস্টিটিউটের অবকাঠামোগত কাজ, জনবল নিয়োগ ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়া শুরু হয় নাই। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন হইতে জানা যায় যে, রাষ্ট্রপতির একান্ত ইচ্ছায় ইনস্টিটিউটটি প্রতিষ্ঠিত হইলেও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় উহা ভিত্তিপ্রস্তরের ফলকেই আটকাইয়া রহিয়াছে। এই ব্যাপারে সর্বশেষ জানা গিয়াছে, ইনস্টিটিউটটির প্রথম প্রস্তাবনায় বাজেট ছিল ৫০ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে নূতন প্রস্তাবনায় বাজেট ১ হাজার কোটি টাকা করা হইয়াছে। নূতন প্রস্তাবনায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মূল কেন্দ্র রাখিয়া কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, গোপালগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়াতে ছয়টি উপকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ছয়টির জায়গায় চারটি উপকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবনা দিয়া নূতন করিয়া কিছু সংশোধনী দিয়াছে। উল্লেখ্য, এই ইনস্টিটিউটের অধীনে ‘ওয়েট ল্যান্ড রিসোর্সেস অ্যান্ড সাসটেইনেবল এগ্রিকালচার’ নামে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়া হইবে। চলতি বত্সরের অক্টোবর-মার্চ সেমিস্টার হইতে ইহার কার্যক্রম শুরুর চেষ্টা চলিতেছে।

বাংলাদেশের হাওরের সর্বসম্মত পরিসংখ্যান নাই। বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের এক দলিলে হাওরের সংখ্যা ৪১৪টি বলা হইয়াছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যসূত্রে এই সংখ্যা ৪২৩। বহু বত্সর ধরিয়া এই বিশাল হাওর অঞ্চল উন্নয়ন হইতে বঞ্চিত হইয়াছিল। যোগাযোগব্যবস্থার অবস্থা ছিল সবচাইতে খারাপ। তবে গত অর্ধযুগে হাওরে বেশ ভালো পরিবর্তনের হাওয়া লাগিয়াছে। দিগন্তবিস্তৃত হাওরের বুক চিরিয়া নির্মিত হইয়াছে পিচঢালা পথ। লাগিতেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। ফসল-মত্স্য উত্পাদনে হাওর অঞ্চলের অবদান সবচাইতে বেশি। দেশে উত্পাদিত মোট ধানের এক-পঞ্চমাংশ আসে হাওরাঞ্চল হইতে। অন্যদিকে দেশের মিঠাপানির মাছের প্রধান ক্ষেত্র হাওরাঞ্চল এবং ঐ অঞ্চল হইতেই সবচাইতে অধিক আমিষ সরবরাহ করা হয়। অথচ ক্ষুধা এই অঞ্চলের মানুষের নিত্যসঙ্গী। হাওরের প্রাণী, হাওরের উদ্ভিদ বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ; প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বস্তুত বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও পরিবেশে হাওরাঞ্চলের অবদান লইয়া নূতন করিয়া কিছু বলার নাই। কিন্তু হাওরবাসী আর্থসামাজিক দিক হইতে নাজুক অবস্থানেই থাকিয়া গিয়াছে। হাওরবাসীর একটি বড় অংশ এখনো বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে। এই ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের জনপ্রতিনিধিরাও বিশেষ ভূমিকা রাখিতে পারেন। হাওরাঞ্চলের সাতটি জেলায় ৩৬টি নির্বাচনি আসন রহিয়াছে। সুতরাং তিন ডজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য হাওরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়নে বড় ভূমিকা পালন করিলে যে কোনো জটিলতারই সুরাহা হইবার কথা। আমরা আশা করিব, এই সকল জনপ্রতিনিধি আরো অধিক সক্রিয় হইবেন উন্নয়নকাজ তদারকির ব্যাপারে। তাহা হইলে কোনো উন্নয়নকাজই দীর্ঘসূত্রতার চক্রে পড়িবে না।