রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় ছিল গোটা পৃথিবী। সম্প্রতি (১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১) ঐতিহাসিক এক ঘটনা ঘটে গেল। লাল গ্রহে পা ছোঁয়াল নাসার মহাকাশযান। নামল ল্যান্ডার ও রোভার ‘পার্সিভিয়ারেন্স’। তার পিঠে ছিল একটি ক্ষুদ্র হেলিকপ্টার ‘ইনজেনুইটি’। যানটি গত ৩০ জুলাই ২০২০ যাত্রা শুরু করেছিল মঙ্গল গ্রহের উদ্দেশে। দীর্ঘ সাত মাস ৪৭০০ লক্ষ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ মঙ্গল গ্রহের মাটিতে নামল নাসার রোভার ‘পার্সিভিয়ারেন্স’। লাল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, তারই চিহ্ন খুঁজবে ছয় চাকার এ রোবটটি। রোবটটি মাটি খুঁড়ে মঙ্গল গর্ভে অণুজীবীদের সন্ধান চালাবে। গ্রহের পাথর-মাটি সংগ্রহ করে নিয়ে আসবে পৃথিবীতে। ভবিষ্যতে মঙ্গলের মাটিতে মানুষ পা রাখলে তাদের জন্যও জরুরি তথ্যপ্রমাণ সেরে আসবে ‘পার্সিভিয়ারেন্স’।
‘পার্সিভিয়ারেন্স’ ছুটে চলছিল মঙ্গলের দিকে এক ভয়াবহ গতিতে, ঘণ্টায় ৬৯ হাজার কিলোমিটার বেগে। পার্সিভিয়ারেন্সের একটি কঠিন কাজ ছিল মঙ্গলের মাধ্যাকর্ষণের টানে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা—যার বৈজ্ঞানিক নাম ‘অরবিট ইনসারসন’। কাজটি কঠিন ছিল। কেননা, ঘণ্টায় ৬৯ হাজার কিলোমিটার গতিবেগ কমিয়ে আনতে হয়েছে ঘণ্টায় ১০ হাজার ৫০০ কিলোমিটারে। এটা করা হয়েছে রকেট ফায়ারের মাধ্যমে। যখন রকেট ফায়ার করা হয়েছিল, তখন গতিবেগ ঘণ্টায় ৩ হাজার ৬০০ কিলোমিটার করে কমতে শুরু করেছিল। গতিবেগ ঠিকভাবে অর্জন করার কাজটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, গতিবেগ একটু বেশি হলে তা মঙ্গল ছাড়িয়ে মহাশূন্যে হারিয়ে যেতে পারত। তখন তাকে আবার ফিরিয়ে এনে মঙ্গলে ‘অরবিট ইনসারসন’ করা সম্ভব হতো না। অন্যদিকে, গতিবেগ যদি একটু বেশি কমিয়ে ফেলা হতো, তাহলে মঙ্গলের মাধ্যাকর্ষণের টানে ‘পার্সিভিয়ারেন্স’ আছড়ে পড়ত মঙ্গলের মাটিতে। সবকিছু কাঁটায় কাঁটায় ঠিক হওয়ার বিষয় ছিল এবং হয়েছিলও ঠিক সেভাবেই। ভালোভাবে অরবিট ইনসারশনের পর অন্যতম কঠিন কাজ ছিল পার্সিভিয়ারেন্সকে মঙ্গলের বুকে নামিয়ে দেওয়া। প্রথমে রকেট ফায়ারিং করে গতিবেগ কমানো হলো, তারপর প্যারাশুট খুলে দিয়ে একদম ধীরগতিতে তা নামানো হলো এবং পরিশেষে স্পেস ক্রেন কাজে লাগিয়ে আলতো করে মঙ্গলের বুকে পার্সিভিয়ারেন্সকে নামানো হলো।
প্রাণের সন্ধানে ‘পার্সিভিয়ারেন্স’ এবার চষে ফেলবে লাল গ্রহের মাটি। তারপর সেই ল্যান্ডার থেকে মঙ্গলের আকাশে ওড়ানো হবে হেলিকপ্টার ‘ইনজেনুইটি’। ‘ইনজেনুইটি’ আকাশ থেকে মঙ্গলের আরো বড়ো এলাকা জুড়ে নজরদারি চালাবে। পৃথিবীর বাইরে এই প্রথম কোনো গ্রহে হেলিকপ্টার ওড়াতে চলেছে মানবসভ্যতা। লাল গ্রহে ল্যান্ডার ও রোভারের অবতরণের জন্য প্রয়োজন ছিল প্যারাশুট। সাড়ে ২১ মিটার ব্যাসের সেই প্যারাশুট খুলতে সময় নিয়েছিল মাত্র ১ থেকে ২ সেকেন্ড। মঙ্গলে পাঠানো এটাই ছিল সবচেয়ে বড় সুপারসনিক প্যারাশুট। এই প্যারাশুট খোলার সময় মুহূর্তের মধ্যেই রাডারের ক্যামেরা কোন জায়গায় নিরাপদ অবতরণ করা সম্ভব, তারও ছবি তুলে ফেলেছিল।
১৯৭৫ সাল থেকেই মঙ্গল অভিযানে অংশ নিয়ে আসছে নাসা। ১৯৭৫ সালে ‘ভাইকিং-১’ নামের ল্যান্ডার, ১৯৭৫ সালে ‘ভাইকিং-২’ নামের ল্যান্ডার, ১৯৯৬ সালে ‘পাথ ফাউন্ডার’ ল্যান্ডার, ১৯৯৬ সালে ‘সোর্জনার’ রোভার, ২০০৩ সালে ‘স্পিরিট’ রোভার এবং ল্যান্ডার, ২০০৩ সালে ‘অপরচুনিটি’ রোভার ও ল্যান্ডার, ২০০৭ সালে ‘ফিনিক্স’ ল্যান্ডার, ২০১১ সালে ‘কিউরিসিটি’ রোভার ও ল্যান্ডার, ২০১৮ সালে ‘ইনসাইট’ ল্যান্ডার এবং সর্বশেষ ২০২০ সালে ‘পার্সিভিয়ারেন্স’ রোভার ও ল্যান্ডার।
মঙ্গলে যে জায়গাটিতে ‘পার্সিভিয়ারেন্স’ অবতরণ করেছে, সেই জায়গাটির নাম ‘জেজোরো ক্রেটার’। কোটি কোটি বছর আগে কোনো সুবিশাল আগ্নেয়গিরির কারণে ঐ দৈত্যাকার গর্তটি (ক্রেটার) তৈরি হয়েছিল। এলাকাটি ২৮ মাইল জুড়ে হলেও গোটা এলাকাটি উঁচু উঁচু পাহাড়ে ভরা। সমতল সেখানে কম। ৩০০ থেকে ৪০০ মিটার অন্তর সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। পার্সিভিয়ারেন্সের ভয় ছিল কোনো সুউচ্চ পাহাড়ে ধাক্কা লাগার, এমনকি পাহাড়ের খাঁজে আটকা পড়ার। কিন্তু সবকিছু ম্যানেজ করে যানটি নিরাপদেই অবতরণ করেছে। এসব দুর্গম পথ পেরিয়ে এবার মঙ্গলে কী করবে ‘পার্সিভিয়ারেন্স’? অন্যতম প্রধান কাজ অবশ্যই মঙ্গলের আকাশে প্রথমবার একটা হেলিকপ্টার ওড়ানো। এবারের পার্সিভিয়ারেন্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মঙ্গলের মাটি থেকে পাথরের টুকরো পৃথিবীতে নিয়ে আসা। এছাড়া ‘পার্সিভিয়ারেন্স’ মঙ্গল গ্রহে আদিম প্রাণের সন্ধান করবে, নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করবে, মঙ্গল গ্রহ মানুষের বাসযোগ্য হতে পারে কি না, তা দেখবে, পানির উত্স খুঁজবে, বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড থেকে অক্সিজেন তৈরির পরীক্ষা করবে, মঙ্গলের মাটি খুঁড়ে নুড়িপাথর সংগ্রহ করবে, অতীতের অণুজীবদের সন্ধান করবে এবং খনিজের সন্ধান করবে। ‘পার্সিভিয়ারেন্স’ রোভারের মধ্যে মোট আটটি যন্ত্র বিদ্যমান। ‘সুপারক্যাম’ ২০ ফুট দূর থেকেও মাটি-পাথরের রাসায়নিক গঠন পরীক্ষা করতে পারবে। ‘মাস্টক্যাম-জেড’ খনিজ পদার্থের সন্ধান করবে। ‘মেডা’ তাপমাত্রা, বায়ুর গতি ও ধুলোর আকার মাপতে পারবে। ‘শেবলক’ অতীতে কী কী অণুজীব ছিল খুঁজে দেখবে। ‘রিমফ্যাক্স’ ১০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত মাটি ফুঁড়ে পানির খোঁজ করবে। ‘মক্সি’ বাতাসের কার্বন ডাইঅক্সাইড থেকে অক্সিজেন তৈরির পরীক্ষা করবে। ‘পিক্সেল’ রাসায়নিক মৌলের সন্ধান করবে। ‘হেলিকপ্টার’ বায়ুমণ্ডলে উড়ে আদিম জীবনের খোঁজখবর নেবে।
ইতিমধ্যে চাঁদের মাটি এসেছে পৃথিবীতে। চাঁদ কিন্তু উপগ্রহ। এবার মঙ্গল গ্রহের মাটি বা পাথর দেখবে পৃথিবী। পুরো পাথর আনা হবে না। পাথরের ভেতর গর্ত করে চকের মতো সিলিন্ডার আকৃতির টুকরো নিয়ে এসে গবেষণা করবে পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা। যেহেতু পাথরের ধাপে ধাপে রয়েছে মঙ্গলের ইতিহাস, তাই এখানকার টুকরো পাথর নিয়ে গবেষণা করতে চায় পৃথিবী। চকের মতো এমন সিলিন্ডার আকৃতির প্রায় ৪০টি টুকরো জোগাড় করে মেটাল সিলিন্ডারে ভরে ‘পার্সিভিয়ারেন্স’ রেখে দেবে মঙ্গলের মাটিতে। ‘পার্সিভিয়ারেন্স’ এখনই ফিরে আসছে না। ২০২৬-২৮ সাল নাগাদ নাসা পাঠাবে আরেকটি মিশন—‘মার্স স্যাম্পল রিট্রিভাল ল্যান্ডার’। সেই মিশনে থাকবে একটি ল্যান্ডার আর একটি রকেট। ‘পার্সিভিয়ারেন্স’ যে চকের টুকরোগুলো মেটাল সিলিন্ডারে ভরে রাখবে, রোভার গিয়ে সেগুলিকে গচ্ছিত করবে রকেটে। সেই রকেট মঙ্গলের বুক থেকে উেক্ষপণ করবে একটি কনটেইনার, যাতে থাকবে মঙ্গলের পাথর বা মাটির নমুনা। ২০৩০ সালে নাসার ‘মার্স স্যাম্পল ক্যাপচার মিশন’ সেই কনটেইনারকে পাকড়ে ধরে নিয়ে আসবে পৃথিবীর বুকে ২০৩১ সাল নাগাদ।
পুরো ব্যাপারটি অনেকটা সায়েন্স ফিকশনের মতো শুনতে লাগছে। কিন্তু এতে কোনো ফিকশন নেই—রয়েছে বিজ্ঞানকে হাতের মুঠোয় পাওয়ার দুঃসাহস। রয়েছে পৃথিবী জয়ের পর বিজ্ঞানের মঙ্গল গ্রহ জয়ের প্রাথমিক ধাপ। নাসার ভবিষ্যত্ পরিকল্পনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—২০২৪ সালে চাঁদে নাসার আর্টেমিস মিশন, ২০২৬ সালে নাসা-এসার যৌথ অভিযান, ২০৩১ সালে মঙ্গলের পাথর ফিরিয়ে আনা এবং ২০৩৫-৪০ সালের মধ্যে মঙ্গলে নভশ্চর পাঠানো। আগামী দুই দশকের মধ্যে মঙ্গল নিয়ে পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের বড় ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে উপনিবেশ গড়তে চাইছেন পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা। আগামী দুই বছর ধরে সে ব্যাপারে খুঁটিনাটি তথ্য জোগাড় করবে ‘পার্সিভিয়ারেন্স’ রোভার। খতিয়ে দেখবে মাটি-পাথর। খুঁজবে প্রাণের স্পন্দনও। পাশাপাশি মানুষের বসতি গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সেখানে রয়েছে কি না, তার উত্তর জানাবে ‘পার্সিভিয়ারেন্স’। ১৯ মার্চ ২০২১-এর পর ইনজেনুইটি হেলিকপ্টারটি এক মাস ধরে উড়বে লাল গ্রহের আকাশে। মাটি ও আকাশ দুই দিক থেকেই এ মিশন মঙ্গলের যতটা সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করবে।
রোভারটি মঙ্গলের মাটি ছোঁয়ার পর উল্লাসে, উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েছিলেন পৃথিবীর তাবত্ বিজ্ঞানী। সেটা ছিল পৃথিবীর জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। পার্সিভিয়ারেন্সে পাঠানো ছবি দেখার অপেক্ষায় ছিল সারা পৃথিবী। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছবি আসতে শুরু করে। সেগুলি দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন বিজ্ঞানীরা। এবার তারা নতুন করে উত্তেজনায় কাঁপছেন—মঙ্গলকে জয় করার নেশায়।
n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা
