সারল্যই ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ রসদ!

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২১, ২০:২৫

করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন আরো একজন বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী, সুরকার ও অডিও প্রকাশক জানে আলম। একবাক্যে সারল্যই ছিল তার প্রতি মানুষের মুগ্ধতার রসদ। নব্বই দশকে গুলিস্তান থেকে পাটুয়াটুলির রাস্তার নিয়মিত কোনো পথিক তাকে এক নজর দেখেনি, এমনটা কেউ বলতে পারবে না। তিনি ছিলেন এমনই মাটির মানুষ। পরিচিত কারো সঙ্গে দেখা হলেই বলতেন, ‘বাবা বাসার সবাই ভালো আছে। তোমার মা কেমন আছে। মায়ের যত্ন নিও।’

গানের, সুরের পথে তারকামথিত যে আবরণ, যে আত্ম-অহঙ্কার থাকে মানুষের তা মোটেই ছিল না জানে আলমের। এ শহরে তার ঘনিষ্ঠজনের অভাব নেই। কিন্তু বরেণ্য গীতিকবি হাসান মতিউর রহমান ছিলেন তার হরিহর আত্মা। মতিউর ভাই আর আলম ভাইকে আমরা ডাকতাম ‘মানিক জোড়’। প্রায় দুুপুরবেলায় নবাবপুরের সাউন্ডটেকের শোরুমে গেলে বেলা গড়ালেই এই মানিক জোড়কে পাওয়া যেত। অডিও প্রকাশক সমিতির নেতা ছিলেন তারা দু’জনই। তাই অডিও শিল্পীর নানা দেন-দরবার, সংকট, সহযোগিতা থেকে সবকিছুই কী সাবলীলভাবে ফায়সালা করতেন তিনি। নব্বই দশকে অডিও প্রকাশনা শিল্পে সাউন্ডটেক আর সঙ্গীতার ছিল তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অথচ খুব দারুণভাবেই জানে আলম সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলতেন।

হাসান মতিউর রহমানকে তার স্মৃতির কথা শুনতে চাইলে বললেন, ‘কোনটা রেখে কোনটা বলবো। প্রথম পরিচয় ১৯৭৮ সালে। তখন আমি ব্যাংকের চাকরি করি, আর গান লিখি। দেখা হলো একদিন। পরিচয়ের নানা সূত্রে জানে আলম ভাই বললেন, ‘মতি ভাই, আপনি তো গান লেখেন। আমার জন্য দুটো গান লিখে দেন। এরপর দুজনের মনের মিলেই বন্ধুত্বের শুরু। জানে আলম ভাই তখন থাকতেন মধুবাগে। প্রতিদিন কী করে যেন নিয়মিত যোগাযোগ হতে হতেই বন্ধুত্বটা নিবিড় হয়ে গেল। গুলিস্তান থেকে পাটুয়াটুলি অবধি আমাদের একটা দারুণ রুটিন ছিল। অমুক সময়ে আমি বা আলম ভাই অমুক জায়গায় থাকবো, এরপর একসঙ্গে রাত নামিয়ে বাড়ি ফেরা। নানা প্রকাশনীতে একসঙ্গেই ঢুকতাম। মিটিং করতাম, আড্ডা দিতাম। প্রতিদিন ঠিক করতাম পরদিন কোথায় খাবো। আলম ভাই ছিলেন ভীষণ ভোজনরসিক। অন্যকে খাওয়াতে পছন্দ করতেন। আমার আর জানে আলম ভাইয়ের রেকর্ডিংয়ের এক অদ্ভুত নিয়ম ছিল। আমার রেকর্ডিংয়ের সময় শিফটের সবাই জানতো সেখানে জানে আলম ভাই থাকবেন। জানে আলমের ক্ষেত্রেও একই। তো জানে আলম ভাই এমনিতে খুব গল্প করতে ভালোবাসতেন। এক কথা থেকে আরেক কথা ডালপালা মেলতো। দেখা গেল জানে আলম ভাইয়ের স্টুডিও শিফট চলছে। তিনি সব মিউজিশিয়ানদের জন্য খাবার-দাবারের মহা আয়োজন করেছেন। এমনিতে শিফটে ঢুকলে কে কতক্ষণ মিউজিশিয়ানদের দিয়ে বাজিয়ে নিতে পারে সেই চেষ্টায় থাকে সকলে। কিন্তু জানে আলম ভাই উল্টো। খেতে খেতে গল্প করতে করতে অর্ধেক শিফট হয়তো শেষ। তখন মিউজিশিয়ানরা উল্টো জানে আলম ভাইকে বলতেন, এত গল্প চললে রেকর্ডিং করবো কখন?’

জানে আলমের বন্ধু সংখ্যা অগণিত। কিন্তু প্রাণের মানুষ ছিলেন কেউ কেউ। তার ভেতরে একজন গানবাংলার কর্ণধার কৌশিক হোনে তাপস। তাপস আর জানে আলমের সম্পর্কও প্রায় ২ যুগ। গত ২ মার্চ যখন মৃত্যু সংবাদ এলো তখন সবার আগে পুরো টিমসহ হাসপাতালে হাজির ছিলেন তিনি। খুব আপন কারো মৃত্যু শোকে যেমন গলা ধরে আসে ঠিক তেমনি কৌশিক হোসেন তাপসও জানে আলমের কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে কেঁদে ফেললেন। বললেন, ‘আমার যেকোনো বিষয়ে তার উচ্ছ্বাস খুব শক্তি দিতো। এই মানুষটাকে আমরা হারিয়ে ফেললাম! আমাকে ডাকতেন দাদাভাই আর আমার স্ত্রীকে বৌ মা। আমরা হয়তো অনেক উপলক্ষে কারো কাছে যেতে পারি না। কিন্তু তিনি যেকোনো উপলক্ষে গানবাংলায় হাজির থাকতেন। গানবাংলার সর্বশেষ বর্ষপূর্তির আগে আমার মেজ মেয়ের অসুস্থতার কারণে আমরা বোস্টনে ছিলাম। তাই সবাইকে ভার্চুয়ালি যোগ করবো বলে ঠিক করলাম। কিন্তু বর্ষপূর্তির দিন তিনিই আমার একমাত্র মুরুব্বি ছিলেন, যিনি সবার আগে হাজির। আমি বললাম, আপনি আমাদের বটগাছ। আপনার সুস্থ থাকা জরুরি। উনি বললেন, আমি একদম ফিট। সেই মানুষটা করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আমরা জানতেও পারলাম না! হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে। কিন্তু চেষ্টা করার সুযোগও তিনি দিলেন না। হয়তো কারো কাছে ঋণ রাখবেন না বলে! এত নিপাট ভদ্রলোক, এত সরল মানুষ আমি দেখিনি এক জীবনে। আল্লাহ তাকে যত্নে রাখবেন আমি জানি। ভালো থাকবেন ভাই।’

এমন হাহাকার মেশানো ভালোবাসাই ছিল গতকাল থেকে পুরো টাইমলাইনে। তাই সকলের আকুলতা প্রকাশ করতে গেলে হয়তো পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা খরচ হয়ে যাবে। সর্বশেষ আমরা সংগীতশিল্পী তানভীর শাহীনের আয়োজনে নিউইয়র্ক ট্যুরে দু’দিন আগের ফ্লাইটে চলে যাই। পরের ফ্লাইটে জানে আলম ভাইয়ের আসার কথা। তাই বাকি সকলেই নিজেদের বাড়িতে ভুলে রেখে আসা কিছু জিনিস নিয়ে আসার আবদার করলেন। স্বভাবতই এ ধরনের কাজে বিরক্তি আসে। জানে আলম উল্টো। নিজের একটা লাগেজ কমিয়ে সবার প্রয়োজনীয় জিনিস মনে করে নিয়ে উড়াল দিলেন। আমি, আমরা সকলেই আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটে একাধিক মঞ্চে তার গানের জনপ্রিয়তা দেখলাম। যাপিত জীবনের পুরোটা সময়ই তিনি এমনই পরোপকারী ছিলেন। না, তাকে নিয়ে বরং গণমাধ্যমে চর্চা কমই হয়েছে। তার সমসাময়িক অন্য অনেকের যেমনটা হয়। কিন্তু তাতে তার মনে আক্ষেপের সুর শোনা যায়নি। মনের আনন্দে গাইতেন। দোয়েল প্রডাক্টস নামে প্রকাশনায় গান বের করতেন। সবই ছিল ভালোবাসাময়। শেষজীবনে গানবাংলার উইন্ড অব চেঞ্জে তার গানের নতুন ফিউশন করা হলে জানে আলম সবাইকে খুব করে বলতেন, তাপস আমাকে মন থেকে ভালোবাসে। খুব সম্মান করতে জানে!

লেখাটি শেষ করি আবারো মানিকজোড়ের গল্প দিয়েই। সেই গুলিস্তান টু নবাবপুরের গল্প। হাসান মতিউর রহমান বললেন, ‘আমি আর আলম ভাই হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি পাটুয়াটুলি। দেখি চার বেহারায় লাশ আসছে। ভীষণ ট্রাফিক জ্যাম! জানে আলম ভাই থমকে দাঁড়ালেন। বললেন, মতি ভাই দেখলেন কী এক মানবজনম! এই আছি, এই নাই। আপনি এই দৃশ্য নিয়া একটা গান লেখেন আমার জন্য প্লিজ। তো আমি তাত্ক্ষণিকভাবে লিখলাম, ‘রঙিলা মন/রঙে ঘোরো/গুলিস্তান আর নবাবপুর। দম ফুরাইলে যাইতে হবে/ একলা আজিমপুর।’ জানে আলম ভাই খুব টাচি একটা সুর করলেন। আমরা দুজন গেলাম বিটিভির বিখ্যাত প্রযোজক ফিরোজ মাহমুদের কাছে। জানে আলম গানটি শুনালেন খালি গলায়। সঙ্গে সঙ্গে বললেন, এখনই রেকর্ডিং করে নিয়ে আসো। আমরা রেকর্ডিং করলাম গীতিবিচিত্রায়। প্রচার হলো।’ সৃজনশীল এমন বরেণ্যদের সৃষ্টিগুলোই থেকে যাবে, একটি গন্ধমের লাগিয়া, দয়াল বাবা কেবলা কাবা, কালি ছাড়া কলমের মূল্য যে নাই’সহ অগণিত গান তিনি রেখে গেছেন। পাশাপাশি সামিনা চৌধুরীর প্রথম অ্যালবামের প্রকাশকও ছিলেন তিনি। এদেশের অগণিত মিউজিশিয়ান তার কাছে ঋণী নানাভাবে। তার কোনো ঋণ নেই। পুরোটা জীবন ভালোবাসা বিলিয়ে দিয়ে গেলেন!