মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের বৈঠকে দেশের প্রধান নির্বাহী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়াছেন, যেহেতু মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলিকে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে, তাই প্রকল্পের কাজে গতি বাড়াইতে হইবে। ইহার সহিত তিনি প্রকল্প পরিচালকদের (পিডি) প্রকল্পের এলাকায় অবস্থান করিবার নির্দেশ দিয়াছেন। উল্লেখ্য, সম্প্রতি তিনি একেক জন পিডির ১০টি, ১১টি, ১৪টি প্রকল্পের দায়িত্বপালনকে ‘ভয়াবহ’ উল্লেখ করিয়া দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার পর এক জন পিডিকে একাধিক প্রকল্প হইতে সরাইয়া লওয়ার কাজ শুরু হইয়াছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সহিত সম্পূর্ণ একমত, এবং তাহার প্রকল্প পরিচালক বিষয়ক নির্দেশনার জন্য সাধুবাদ জানাই। তিনি দীর্ঘকাল ধরিয়া দেশ পরিচালনা করিতেছেন এবং বাস্তবতার আলোকে তিনি অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। তাহার দেখিবার শক্তিও প্রখর। কিন্তু তাহার পরও দেশের প্রধান নির্বাহী হিসাবে তিনি যাহা বলিতেছেন তাহা অনুসরণ করা সম্ভব হইতেছে কি? তিনি পূর্বেও প্রকল্পের কাজ সঠিক সময়ে শেষ করিবার কথা বলিয়াছেন, কিন্তু তাহা করা হয় নাই, এবং করা যায় নাই। বরং আমরা দেখিয়াছি, দেশে সরকারি কোনো প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শুরু হইয়া যথাসময়ে শেষ হইবার খুব অধিক নজির নাই। প্রায় সকল প্রকল্পেই দেখা যায়, দফায় দফায় সময় বৃদ্ধির অঘোষিত নিয়ম হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহাতে প্রকল্পের ব্যয় বহু গুণে বাড়িয়া যায়।
প্রকল্প বাস্তবায়নে কেন বিলম্ব হয়, আমরা ইহার কারণ কিছুটা বুঝিতে পারি। ইহাতে গোষ্ঠীগত স্বার্থ তো রহিয়াছেই, আরো রহিয়াছে ব্যবস্থাগত জটিলতা। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অন্যতম জটিল অংশটি হইল ফাইল প্রসেসিং। বিভিন্ন হাত ও টেবিল কয়েক দফা ঘুরিয়া তাহার পর প্রকল্প পাশ হয়। প্রকল্পের ফাইলও অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় বিচরণ করে। এইখানে ফাইল এসও, এসডি, প্রধান প্রকৌশলী, প্রশাসন, টেকনিক্যাল কমিটি, বিভিন্ন স্তরের সচিব হইয়া প্ল্যানিং সচিব এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর টেবিল ঘুরিতে থাকে। তাহার পর দেখিতে হয় প্রকল্পের জন্য টাকা আছে কি না, যাচাই-বাছাই করিয়া ফেরত পাঠানো হয় অধিদপ্তরে, প্রি-একনেকের পর একনেকে প্রকল্প যাচাই হয়। একটি প্রকল্পের পেছনে ছুটিবার মতো মানুষ থাকিলেও দেখা যায় আট-দশ মাস অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে। আর ঠেলিবার লোক না থাকিলে প্রকল্প স্থবিরও হইয়া যায়। ইহার পর কাজের দরপত্র আহ্বান। সেইখানে শুরু হয় আরেক খেলা। টেন্ডার দাখিলের সময় হইতেই শুরু হয় দক্ষিণ হস্তের কারবার। অনেক ক্ষেত্রেই অন্যের লাইসেন্সে ভাগবাঁটোয়ারা করিয়া কাজ করা, অন্যের কাছে কাজ বিক্রয় করিয়া দেওয়া, বিলম্বে কাজ শুরু করা, কিছুটা কাজ করিয়া বিলের টাকা তুলিয়া পুনরায় কাজ বন্ধ রাখা—এইগুলি খুব সাধারণ চিত্র। ইহা ছাড়াও প্রকল্পে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের অভাব, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, ডিপিপি তৈরির সময় দ্রব্যের মান ও মূল্য নির্ধারণে অদূরদর্শিতা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে নূতন নূতন অঙ্গসংযোজনের সমস্যা তো রহিয়াছেই। সুতরাং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব তো হইবেই! স্পষ্টতই, ইহাতে দুর্নীতির শিকড়ও বৃদ্ধি পাইতে থাকে। অপচয় হয় রাষ্ট্রীয় অর্থের।
আমাদের বক্তব্য হইল, এত প্রকল্প অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা কী যদি তাহা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হয়? প্রয়োজনে প্রকল্পের সংখ্যা কমাইয়া দিন এবং যতটুকু সুচারুরূপে করা যাইবে, ততটাই অনুমোদন দেওয়া হউক। অর্থাত্ ‘ছোট হউক তবু মোর কাঁচা ঘর খাসা।’
