২৬ মার্চের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের আলটিমেটাম

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২১, ২৩:১২

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার লেখক মুশতাক আহমেদের কারাগারে মৃত্যুর প্রতিবাদ ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে যাত্রা করেছিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে বিভিন্ন সংগঠনকে নিয়ে গড়ে তোলা প্ল্যাটফরম ‘নাগরিক সমাজ’। গতকাল বুধবার প্রেসক্লাব থেকে শুরু করে মিছিলটি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে এলে সেখানে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বাধা দেয়। বাধা পেয়ে সেখানেই মিছিল শেষ করেন আন্দোলনকারীরা। সেখান থেকে আগামী ২৬ মার্চের মধ্যে ‘নিবর্তনমূলক’ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের আলটিমেটাম দেয় নাগরিক সমাজ।

বেলা ১১টায় প্রেসক্লাবের সামনে নাগরিক সমাবেশ শুরু হয়। সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আজকে আমাদের দাবি একটাই, এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে দিতে হবে। আমরা সংস্কার চাই না, আমরা এটা বাতিল চাই।’ এ আইনের অধীনে গ্রেফতার সবাইকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

সমাবেশে ড. কামাল হোসেনের পাঠানো সংহতি বক্তব্য পড়ে শোনান তার দল গণফোরামের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোশতাক আহমেদ। তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে মুক্ত চিন্তা, বাক্স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চরমভাবে খর্ব করা হয়েছে। এই আইনের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো সংশোধনের জন্য বার বার অনুরোধ করার পরও সরকার এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বরং এর অপব্যবহার বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই কালো আইনটির অপব্যবহারের চরম বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে লেখক মুশতাক আহমেদের কারা হেফাজতে মৃত্যু।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও এই নাগরিক সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে একটি লিখিত বক্তব্য পাঠান। ঐ বক্তব্যে বলা হয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ইচ্ছা মতো মামলা দেওয়া হচ্ছে, মানুষ গ্রেফতার হচ্ছেন, নাজেহাল হচ্ছেন। সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল তো গুমই হয়ে গিয়েছিলেন। সীমান্ত এলাকায় যখন তাকে দেখা গেল, তখন অসুস্থ মানুষটিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার দেখানো হলো। জামিনের চেষ্টা হলো, কাজ হলো না। শেষে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহল থেকে যখন প্রতিবাদ হলো, লেখালেখি হলো, তখন কোনোমতে জামিন পেলেন। মুশতাক আহমেদ তো তা-ও পেলেন না। ছয় বার আবেদন করেছেন, গ্রাহ্য হলো না, সপ্তমবার আর প্রয়োজন হলো না। তিনি চিরমুক্ত হয়ে চলে গেলেন।

সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত আজকে স্বাধীনতার সুর্বণজয়ন্তী উদ্যাপন করতে গিয়ে বাক্স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করছি। এর চেয়ে লজ্জার কিছু আর হতে পারে না।’ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘এ আইনটি মানুষের স্বাধীনতা, আমাদের স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থি।’

দুই বছর আগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে কাটানোর কথা তুলে ধরে আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, ‘এতগুলো লেখক, যাদের প্রত্যেকের দাঁড়িয়ে কথা বলা দরকার ছিল, তারা সেটা করেননি, এতগুলো কার্টুনিস্ট, যারা এতদিন প্রতিবাদী কার্টুন করে গেছেন, তারা কিশোরের জন্য প্রতিবাদী কার্টুন করেননি। সেই জায়গা থেকে আমাদের সরে যেতে হবে।’ সমাবেশের একপর্যায়ে হাইকোর্টে কার্টুনিস্ট কিশোরের জামিন পাওয়ার খবর এলে উপস্থিত সকলে করতালি দেন।

এদিকে প্রেসক্লাব থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি হাইকোর্ট, মত্স্য ভবন, আইইবি হয়ে শাহবাগ মোড় পার হলে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে পুলিশ আটকে দেয়। পুলিশের অনুরোধে সেখানেই বক্তব্য রেখে পদযাত্রা সমাপ্ত করেন আন্দোলনকারীরা। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে জাফরুল্লাহ চৌধুরী ২৬ মার্চের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের জোর দাবি জানান। পদযাত্রা আটকে দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন পুলিশের রমনা জোনের ডিসি সাজ্জাদুর রহমান।

লেখক অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদ, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা এ পদযাত্রায় অংশ নেন। এদিকে আন্দোলন থেকে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তির দাবিতে সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় মশাল মিছিল বের করে প্রগতিশীল ছাত্রজোট।