ইথিওপিয়াও হতে যাচ্ছে মধ্যম আয়ের দেশ!

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২১:১২

মধ্যাহ্ন বিরতি শেষ। সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শ্রমিকরা। তারপর একে একে অভিবাদন জানিয়ে ফের প্রবেশ করছে কর্মস্থলে। ইথিওপিয়ার হুয়াজিয়ান নামক জুতা তৈরির প্রতিষ্ঠানে এটিই নিয়ম। এর কর্ণধার সাবেক সেনা কর্মকর্তা ঝাং হুয়া রং। নামেই অনুমেয় যে, তিনি চায়নিজ। হুয়াজিনের মুখপাত্র নারা ঝৌ প্রসঙ্গক্রমে বলছিলেন, ‘আমাদের ফ্যাক্টরি কিছুটা সামরিক সংস্থার মতোই। এখানকার শ্রমিকরা উচ্চ শিক্ষিত নয়। যে কারণে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সংগঠিত করার কাজে খুব সাধারণ একটা উপায় বেছে নিয়েছি আমরা।’ প্রতিষ্ঠানের ভেতরে লাল একটি ব্যানারে চীনা, আমহারিক ও ইংরেজিতে লেখা রয়েছে, ‘চীন-আফ্রিকা প্রীতি ও সহযোগিতামূলক একটি প্রতিষ্ঠান। আমরা এদেশের জন্য সম্মান বয়ে আনতে চাই এবং উচ্চ স্তরের গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।’

হুয়াজিয়ানের ইথিওপীয় কারখানায় নিযুক্ত রয়েছে ইথিওপিয়ার ৩ হাজার শ্রমিক। এখানে উত্পাদিত হয় গেস, ন্যাটারালাইজার টম-এর মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জুতা। বার্ষিক রপ্তানি মূল্য ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। এইচএন্ডএম-এর মতো ব্র্যান্ডও এখন ইথিওপিয়া থেকে জুতা আমদানি করছে। ২০১৩ সালে ইথিওপিয়ার মোট রপ্তানি আয়ের ৩ শতাংশ এসেছিল টেক্সটাইল ও চামড়া সামগ্রী থেকে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এ বছর এই দুই সামগ্রী থেকে রপ্তানি আয় ২০১৩ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এশিয়ায় উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় হুয়াজিনের মতো বেশকিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প খুঁজতে খুঁজতে ইথিওপিয়ায় ঠিকানা করে নিয়েছে। দেশটিতে শুল্কের ঝামেলা নেই; রয়েছে সস্তা শ্রম এবং স্থিতিশীল রাজনৈতিক আবহ। অতএব, কে না চায় এই সুযোগগুলো গ্রহণ করতে।

শুরুতে ইথিওপিয়ার একজন শ্রমিকের মাসিক বেতনের পরিসর ৩৫ থেকে ৪০ মার্কিন ডলার, চীনে যেটি ৬২৯ মার্কিন ডলার। ২০০০ থেকে ২০১০ এই সময়ে চীনে শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে তিন গুণ। বাংলাদেশে গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যুনতম মাসিক মজুরি ৬৮ মার্কিন ডলার। সে জায়গায় সরকারি কর্মচারীদের বাদে ন্যূনতম মজুরির কোনো বিধানই নেই। এ ব্যাপারে ইথিওপিয়ার বিনিয়োগ এজেন্সির রপ্তানি উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক আকিলু ওল্ডারমারিয়াম মন্তব্য করেছেন, ‘ আন্তর্জাতিক মানের শ্রম আইন আছে আমাদের দেশে; কিন্তু সরকার ন্যূনতম মজুরির ব্যাপারে হস্তক্ষেপে উত্সাহী নয়।’ নূ্যূনতম মজুরির অনুপস্থিতির মানে মার্কেট ডাইনামিকস কারখানার শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করে। ইথিওপিয়ায় শহুরে বেকারত্বের হার ১৮ শতাংশ। অনেকেই যে কোনো মজুরিতে কাজে লেগে পড়ে। এ ছাড়া তাদের সামনে আয়ের যে কোনো পথ নেই। রাজধানী আদ্দিস আবাবায় আইকা টেক্সটাইলে কর্মরত ২৪ বছর বয়স্ক শ্রমিক মেনিরাট আশরাত পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে— চাকরি থাকায় আমি খুশি, কিন্তু আমার সামনে অন্য কোনো অপশান থাকলে এ চাকরি অনেক আগেই ছেড়ে দিতাম। যে মজুরি পাই, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে কিছুতেই চলা যায় না। ফ্যাক্টরিতে সম্প্রতি মজুরি বাড়ানো সত্বেও আশরাতের মাসিক মজুরি মাত্র ৪১ ডলার।

মজুরি বৃদ্ধিসহ স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মান বাড়ানো দাবি জোরালো হয়ে উঠছে ইথিওপিয়ায়। শ্রমিকদের অধিকারের ব্যাপারে ইদানীং অনেকেই সরব হয়ে উঠেছেন। এর সুফলও আসছে।

যদিও ইথিওপিয়ার সংবিধানে শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা আছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন ঘটছে কদাচিত্। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফেডারেশন অফ ইথিওপিয়ান টেক্সটাইল, লেদার এন্ড গার্মেন্ট ওয়ার্কার ট্রেড ইউনিয়নের মুখপাত্র জানিয়েছেন, মালিকরা ট্রেড ইউনিয়নের ব্যাপারে আপত্তি করলে কার্যত শ্রমিকদের কিছুই করার থাকে না। এ ক্ষেত্রে সরকার অনেকটাই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। বড় বিদেশি ক্রেতারা চাপ দিলে বরঞ্চ অনেক প্রতিষ্ঠান ট্রেড ইউনিয়নের ব্যাপারে নরম হয়।

২০০০ থেকে ২০১৪, এ সময়ে ইথিওপিয়ার গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১০.৪ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে দেশটি। আদ্দিস আবাবাস্থ ইন্টারন্যাশনাল ল এন্ড পলিসি ইনস্টিটিউট অফিস-এর উপদেষ্টা ও রিসার্চ প্রফেসর দেরেজি ফেয়েসি দরি’র অভিমত, ইথিওপিয়ার সরকার ভয় পায় যে, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করলে না আবার বিদেশি বিনিয়োগকারী চলে যায়। কিন্তু সরকার যে জিনিসটি বুঝতে পারছে না, তা হলো— এখানকার চেয়ে সস্তা শ্রম পাওয়া হবে বিরল ঘটনা। ইথিওপিয়াতে জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে ন্যূনতম মজুরি হওয়া উচিত ২ হাজার বির (ইথিওপিয়ার মুদ্রা, ২০ বির সমান ১ মার্কিন ডলার)। অদূর ভবিষ্যতে যা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। মোদ্দাকথা, এই মুহূর্তে সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দর কষাকষি করতে চাচ্ছে না। ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করলে তাদেরও তা মানতে হবে। সে অজুহাতেই তারা সেটি ছেড়ে দিয়েছে বাজারের ওপর। নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করাটাই সরকারের মূল লক্ষ্য।

—ফরেন পলিসি অনুসরণে