বায়ুদূষণ :দুর্যোগপূর্ণ অবস্থানে ঢাকা

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২১, ২১:০২

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান এয়ার ভিজ্যুয়ালের সর্বশেষ তথ্যমতে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরী হচ্ছে ঢাকা। এয়ার ভিজ্যুয়াল প্রতি ঘণ্টায় বিশ্বের প্রধান প্রধান শহরগুলোর বায়ুদূষণের তথ্য প্রদান করে। ঐ রিপোর্ট অনুযায়ী গত ২১ জানুয়ারি ২০২১ ঢাকা ছিল বায়ুদূষণের শীর্ষস্থানের শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। অতীতের রেকর্ড অতিক্রম করে ২১.১.২০১৯ তারিখ (সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা) চার ঘণ্টার জরিপে বেরিয়ে এসেছে বিশ্বের বায়ুদূষিত শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান প্রথম স্থানে। তার আগের দুই দিনও ঢাকার অবস্থান ছিল বায়ুদূষণে ১ নাম্বার। ঐ সময় শহরের বায়ুদূষণের পরিমাণ ছিল ৩২৬ পিএম। অন্যদিকে গত ১০ জানুয়ারি দূষণের মাত্রা ছিল ৫০২ পিএম। বায়ুবিশারদদের মতে ৩২৬ মানে হচ্ছে দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা।

প্রচার মাধ্যমে বিষয়টি জানাজানি হলে পরিবেশবিদরা ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তারা ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা, মোটরযানের কালো ধোঁয়া, কলকারখানার ধোঁয়া, ধুলাবালি ও নির্মাণ কাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়িকে দায়ী করেন। সমীক্ষায় জানা যায়, ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের প্রধান উত্স ইটভাটা থেকে নির্গত কার্বন মনোঅক্সাইড ও অক্সাইড অব সালফার। যা নির্গত হওয়ার ফলে রাজধানীর প্রায় ৫৮ শতাংশ বায়ুদূষণ ঘটছে। এছাড়াও রোড ডাস্ট, সয়েল ডাস্ট ১৮ শতাংশ, যানবাহন ১০ শতাংশ, বায়োমাস পোড়ানো ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য উত্স ও শিল্পকারখানার দূষিত ধোঁয়ার মাধ্যমে ঘটছে ৬ শতাংশ।  বিশেষ করে ইটভাটা থেকে নির্গত কার্বন মনোঅক্সাইডের প্রভাবে ঢাকা এবং আশপাশের বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ইটভাটার প্রভাবে আশপাশে তুলনামূলকভাবে বৃষ্টিপাতও কমে গেছে। এর অন্যতম কারণই হচ্ছে চিমনি দিয়ে নির্গত কালো ধোঁয়া প্রবাহিত হওয়া। কালো ধোঁয়া এবং অধিক কার্বন মনোঅক্সাইড গ্যাসের প্রভাবে আকাশে কোনো ধরনের মেঘ পুঞ্জীভূত হতে পারে না বরং আকাশের মেঘটাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে বৃষ্টিপাতে বিঘ্ন ঘটায়।

ইটভাটার সারি শুধু ঢাকা জেলার সাভার, কেরানীগঞ্জ নয়, এ সারি দেখা যায়, গাজীপুর নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জসহ দেশের অন্য জেলাগুলোতেও। তবে রাজধানীর আশপাশের  জেলা-উপজেলাগুলোতে তুলনামূলকভাবে বেশি নজরে পড়ে। ২০১৮ সালের জরিপে জানা গেছে, সমগ্র দেশে ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার ৯০২টি। তার মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২ হাজার ৪৮৭টি। ভাটাগুলোতে বছরে কয়লা পোড়ানো হয় এক মিলিয়ন টনেরও বেশি। আর এ থেকে প্রতিবছর কার্বন মনোঅক্সাইড নির্গত হয় প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ টন। এ ছাড়াও ইটভাটা থেকে নির্গত হয় বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর ধোঁয়া। যা থেকে গ্রিনহাউজ প্রতিক্রিয়া ঘটে ব্যাপকভাবে। ইটভাটার মালিকরা যদি একটু সতর্ক বা সচেতন হতেন, তাহলে এ ক্ষতিকর দিক থেকে দেশ, জাতি কিংবা পরিবেশকে বাঁচাতে পারেন অবলীলায়, সাশ্রয় করতে পারেন নিজেদের অর্থনৈতিক দিকটাও। এর থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে ইটভাটাগুলোকে ইট কারখানায় রূপান্তরিত করা।

যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কেন্দ্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ পরিচালিত যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার রাস্তার ধুলায় উচ্চমাত্রার ক্যাডমিয়াম, সিসা, দস্তা, ক্রোমিয়াম, নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ ও কপারের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে ঢাকায় বসবাসরত ২ কোটি মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়ত ৬ লাখ মানুষ বায়ুদূষণের শিকার হচ্ছেন। তার মধ্যে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন রোগে ভোগছেন। অনেকে আবার বেঁচে থাকার লড়াইয়ে হেরেও যাচ্ছেন, তার পরেও রোগের কারণ বুঝতে সক্ষম হননি সর্বসাধারণ। তারা জানেন না, বায়ুদূষণের কারণে মানুষ শ্বাসজনিত সমস্যা, নিউমোনিয়া, হূদেরাগ, স্ট্রোক, ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। উল্লেখ্য, বড়দের তুলনায় শিশুরা ৩০ শতাংশ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। গবেষণায় জানা গেছে, মাটির কাছাকাছি বাতাসের সর্বনিম্ন স্তরে থাকে বিষাক্ত ধোঁয়াশা। শিশুরা উচ্চতায় খাটো বিধায় নিঃশ্বাসের সঙ্গে ঐ ধোঁয়াশা দ্রুত ফুসফুসে প্রবেশ করায় রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে।

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের গবেষণায় জানা যায়, ফুসফুস ক্যানসারের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হচ্ছে বায়ুদূষণ। এছাড়াও প্রতিনিয়ত লিভারের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ছে বায়ুদূষণের কারণে। ২০১০ সালের এক অনুসন্ধানী রিপোর্টে জানা গেছে, বায়ুদূষণের ফলে ফুসফুস ক্যানসারে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ঢাকা নয়, বিশ্বের অধিকাংশ বড় শহরগুলো বায়ুদূষণের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী বছরে ৫ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুও ঘটছে। এছাড়াও বায়ুদূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু ১ বছর কিংবা তারও বেশি কমে যাচ্ছে। সমীক্ষায় জানা গেছে, প্রতিদিন ঢাকা শহরে ৪৩৬ টন ধূলিকণা গাছগাছালির ওপরে জমছে। এ ছাড়াও রাস্তাঘাটে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে ধুলার আস্তর জমছে।

উপরোক্ত বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হচ্ছে, সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে এই দূষণ থেকে উত্তরণের পদক্ষেপ নিতে হবে দ্রুত। ঢাকার আশপাশের অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে দিতে হবে। শহরের রাস্তাগুলোকে দিনে অন্তত এক-দুই বার পানি ছিটিয়ে ধূলিদূষণ কমাতে হবে। সম্ভব হলে সপ্তাহে এক দিন রাস্তার পাশের গাছপালাকে পানি দিয়ে ধোয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি দায়ী বিষয়গুলোকে শনাক্ত করে নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে হয়তো শতভাগ সমাধান না হলেও খানিকটা নিয়ন্ত্রণে আসবে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরগুলোর বায়ুদূষণ।

n লেখক :কথাসাহিত্যিক ও বন্যপ্রাণী বিশারদ