চিরনিদ্রায় শায়িত এইচ টি ইমাম

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২১, ২২:৫৩

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হোসেন তৌফিক ইমাম, যিনি এইচ টি ইমাম নামেই পরিচিত। একজন ডাকসাইটে আমলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা। সরকারি চাকরি শেষ করে দীর্ঘ কর্মময় জীবনেও হয়ে উঠেছিলেন একজন জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ। এই কর্মবীরের জীবনাবসান হয়েছে। গত বুধবার দিবাগত রাত ১টা ১৫ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) এইচ টি ইমাম ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। কিডনি জটিলতাসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন অসুস্থতা নিয়ে এইচ টি ইমাম গত ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হন।

তার মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চিরনিন্দ্রায় শায়িত হয়েছেন এইচ টি ইমাম। সকালে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া এবং বিকালে ঢাকার গুলশানে জানাজার পর বনানী কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় মুক্তিযুদ্ধের এই সংগঠককে। দুপুরে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে রাখা হয়। দুটি জানাজায় ও কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে মানুষের ঢল নামে।

শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধে এইচ টি ইমামের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্বাধীনতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে আজীবন কাজ করে গেছেন। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সদ্য স্বাধীন দেশে সরকার পরিচালনায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতাকে হারাল।’

শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রশাসনিক সার্ভিসে এইচ টি ইমামের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের পুরো সময়টাও তিনি একই পদে থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৯ সাল থেকে এইচ টি ইমাম আমার প্রশাসনিক উপদেষ্টা হিসেবে এবং ২০১৪ সাল থেকে আমৃত্যু রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে প্রজাতন্ত্রের সেবক হিসেবে কাজ করেন।’

এছাড়া শোক জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, অওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া এমপি, চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী এমপি, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের, জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া প্রমুখ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, এইচ টি ইমাম প্রতিটি কর্মে দেশপ্রেমের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। শহিদ মিনারে মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে এইচ টি ইমামের ছেলে তানভীর ইমাম এমপি বলেছেন, ‘বাবা কখনো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।’ তানভীর ইমাম আরো বলেন, ‘আমার পিতা সব সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন করতেন। এ আদর্শ থেকে বাবা কখনো বিচ্যুত হননি।’

জেপির শোক

জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় নেতৃদ্বয় বলেন, মরহুম এইচ টি ইমাম ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী কেবিনেট সেক্রেটারি ছিলেন। সাবেক সিএসপি এই কর্মকর্তা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি ছিলেন প্রাক্তন সচিব এবং একজন দক্ষ কর্মকর্তা। পরে তিনি রাজনীতিতে যোগদান করেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের এই সদস্যের মৃত্যুতে দেশ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিত্বকে হারাল। জেপি নেতৃদ্বয় মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।

এছাড়া শোক জানিয়েছেন র্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। শোক বার্তায় তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী এইচ টি ইমাম এক বর্ণাঢ্য পেশাগত জীবনের অধিকারী ছিলেন।

এইচ টি ইমামকে শেষ শ্রদ্ধা

দুপুর সাড়ে ১২টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে নিয়ে যাওয়া যায়। সেখানে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষ তার কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনে প্রথমে রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এস এম সালাহ উদ্দিন ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমদ চৌধুরী পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। এরপর আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য মুকুল বোস, প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবীর নানক, আব্দুর রহমান, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রমুখ। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর পক্ষ থেকে সংসদের সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস কমোডর এম এম নাঈম রহমান শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে এইচ টি ইমামের প্রতি শ্রদ্ধা জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এছাড়া এইচ টি ইমামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষকলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তি পর্যায়ের মানুষ।

শহিদ মিনার থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গুলশানের আজাদ মসজিদে। সেখানে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মরহুমের আত্মীয়স্বজনদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বর্তমান ও সাবেক সচিব, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের পদস্থ কর্মকর্তা এবং এইচ টি ইমামের দীর্ঘ কর্মজীবনের সহকর্মী ও সহযোদ্ধারা অংশ নেন। পরে এইচ টি ইমামকে বনানী কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ‘গার্ড অফ অনার’ দিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

আমলা হয়েও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন

১৯৭১-এর মার্চ মাসে এইচ টি ইমাম রাঙ্গামাটি জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আমলা হয়েও পাকিস্তানের আনুগত্য ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রবাসী সরকারের অধীনে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদায় তার জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। ২০১৪ সালে তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর আওয়ামী লীগে সক্রিয় হন এইচ টি ইমাম। দলের নির্বাচন পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি।

১৯৩৯ সালের ১৫ জানুয়ারি টাঙ্গাইল শহরে জন্মগ্রহণ করেন এইচ টি ইমাম। তার পিতা তাফসির উদ্দীন আহমেদ বিএ, বিএল ও মাতা তাহসিন খাতুন। পিতার চাকরি সূত্রে শৈশবে তিনি রাজশাহীতে বড় হন। সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন। পরে লেখাপড়া করেছেন পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া ও কলকাতায়। ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেছেন ঢাকা কলেজিয়েট হাইস্কুল থেকে। ১৯৫৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ভর্তি হন। সেখানে পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৫৮ সালে ঢাবি থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন। এইচ টি ইমামের সহধর্মিণী ১৪ বছর আগে মারা গেছেন। তিন মেয়ে ও এক ছেলের জনক। তিন মেয়ে আমেরিকায় বসবাস করেন। এইচটি ইমামের ছেলে তানভীর ইমাম সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য।