দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে শিশুর দণ্ড দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে কোনো শিশুকে সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না মর্মে রায় দেওয়া হয়েছে। আদালত বলেছে, স্নায়ু বিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্ব গবেষণা অনুযায়ী শিশুরা তাদের কর্মের পরিণতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল নন। তারা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বস্তুত মস্তিষ্কের যে অংশ আবেগ ও যৌক্তিকতা নিয়ন্ত্রণ করে, শিশু অবস্থায় ব্রেইনের সে অংশ পরিপক্ব হয় না। শিশুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির তাই কোনো সাক্ষ্যগত মূল্যও নেই। ‘মো. আনিস মিয়া বনাম রাষ্ট্র’ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছে হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ।
রায়ে বলা হয়েছে, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির পরিণতি সম্পর্কে শিশুদের সম্যক ধারণা নেই। অনেক ক্ষেত্রে তারা দোষ নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে নেয়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা পাওয়ার প্রলোভনে তারা জবানবন্দি দিতে রাজি হয়ে যায়। এ কারণে কোনো শিশুকে সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের জবানবন্দিকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বৃহত্তর বেঞ্চের বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস এ রায় লিখেছেন। রায়ে একমত পোষণ করে তাতে স্বাক্ষর করেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. শওকত হোসেন ও কনিষ্ঠ বিচারপতি এস এম আব্দুল মুবিন।
রায়ে বলা হয়েছে, স্পর্শকাতর অনেক মামলায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুর পিতামাতাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর এনিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর শিশু আর মানসিক ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারে না। পিতামাতা বা অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদে শিশুর মনে মানসিক চাপ সৃষ্টি ও ভীতির সঞ্চার হয়। তারা মুক্তির জন্য অসত্য বক্তব্য দিয়ে থাকে। তাই অপরাধ যাই হোক না কেন, আটক বা বিচারের সময় অভিযুক্ত শিশুর শৈশব পেরিয়ে গেলেও তাকে ১০ বছরের বেশি সাজা দেওয়া যাবে না।
১ লাখ টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় নেত্রকোনার কমলাকান্দার শিশু সৈকতকে (৭) অপহরণের পর হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় ২০১১ সালের ১৩ অক্টোবর শিশু আনিস মিয়াকে ১০ বছরের সাজা দেয় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪। শিশু আদালত থাকার পরেও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল কোন এক্তিয়ারবলে শিশু আনিসের বিচার সম্পন্ন করে সাজা দিল তা নিয়ে উত্থাপিত আইনগত প্রশ্নের নিষ্পত্তির জন্য এই বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি। আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষ ছাড়াও তিন জন অ্যামিকাস কিউরি বক্তব্য শোনে আদালত। এর পরই ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১০ বছরের সাজা বাতিল করে এ রায় দেয় হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়েছে, আইন দ্বারা যদি ক্ষমতা দেওয়া না হয় তাহলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল শিশুর অপরাধের বিচার করতে পারবে না। এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে।
