বলা হচ্ছে, পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ এখন শহরমুখি এবং শহরের লোকসংখ্যা ২০৩০ সালের মধ্যে শতকরা সত্তর ভাগ বেড়ে যাবে। নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা এমনভাবে করা উচিত যাতে জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া না পড়ে, সেটা গাছের ক্ষেত্রে হোক কিংবা কোনো পোকামাকড়ের ক্ষেত্রেই হোক। এটা ইকো সিস্টেম ফিরিয়ে আনার জন্য খুব জরুরি। বড় শহরগুলোতে শিল্পকারখানার বর্জ্য, যানবাহন থেকে সৃষ্ট দূষিত ধোঁয়া পরিবেশ দূষণ করছে, যা জনস্বাস্থ্যের ওপর ফেলছে ক্ষতিকর প্রভাব। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে আমরা প্রতিদিন ধ্বংস করছি গাছপালা আর সবুজ আচ্ছাদন। ভরাট করছি জলাশয়। নষ্ট করছি জীববৈচিত্র্য। বায়ু ও শব্দ দূষণের ফলে নগরবাসী আক্রান্ত হচ্ছে দুরারোগ্য ব্যাধিতে।
বিশ্বের শহরগুলোর বাসযোগ্যতা সম্পর্কে ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ঢাকা শহরের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বসবাসের সুযোগ-সুবিধার দিক দিয়ে বিশ্বের ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭। অথচ ঢাকা একদা সুন্দর শহর ছিল। ১৯১১ সালের আগ পর্যন্ত ঢাকা ছিল প্রাদেশিক রাজধানী। এই রাজধানীর মর্যাদা হারানোর পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে নতুন এক ঢাকা গড়ে উঠেছিল। খুব বিত্তের বৈভব না থাকলেও পুরনো শহরের আভিজাত্য আর নতুন স্থাপনাগুলোর সহজ সৌন্দর্য মিলে দৃষ্টিনন্দন নগর সৃষ্টি হয়েছিল। ঢাকা ছিল সেই সময়কার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চাভূমি। তবে প্রশাসকরা ঢাকাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা সাজালেও দেশের অন্যান্য শহর নিয়ে সে রকম পরিকল্পনা ছিল না। সে কারণেই ঢাকার মতো আর কোনো শহর গড়ে ওঠেনি।
অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়নের ফলে বসবাসকারীরা নানাবিধ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বিশৃঙ্খল নগর উন্নয়ন, বেকারত্ব, পরিবেশের অবনতি, মৌলিক সেবাপ্রাপ্তির অভাব, অপরাধ এবং দরিদ্র জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ নানাবিধ সমস্যা দেখা দেবে। এজন্য সুষম ও টেকসই নগরায়ন নিশ্চিতকল্পে উপযুক্ত নীতিমালা গ্রহণ জরুরি। ৫০ বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি হারে নগরায়ন হয়েছে বাংলাদেশে। তবে বাংলাদেশে যে হারে এগোচ্ছে, উন্নত দেশগুলো ১৯ শতকে এই হারেই অগ্রসর হয়েছিল। এসব তথ্য দিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের লিভারেজিং আরবানাইজেশন ইন সাউথ এশিয়া: ম্যানেজিং স্পেশাল ট্রান্সফরমেশন ফর প্রসপারিটি অ্যান্ড লিভেবিলিটি শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ নগরে বাস করছে। নগরায়নের এই মাত্রা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৫১ সালে বাংলাদেশের ৫৫ শতাংশ মানুষ নগরে বাস করবে।
বিশ্বের শহরগুলোর বাসযোগ্যতা নির্ণয় করা হয় স্থায়িত্ব, স্বাস্থ্য পরিসেবা, সংস্কৃতি, পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে। এগুলোকে অবহেলা বা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এগুলো শুধু একটি দেশের শহরের বাসযোগ্যতাকেই বোঝায় না, সারা দেশের সার্বিক সমৃদ্ধির প্রতিও ইঙ্গিত করে। আমাদের সৌভাগ্য—জনসংখ্যা, যানজট, জলাবদ্ধতা, বিদ্যুত্, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে বাসযোগ্যতার মাপকাঠিতে বিবেচনা করা হয়নি।
আমরা মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব, সবুজ ও টেকসই নগরের কথাই বলছি বারবার। আমরা বলছি ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে নগর ও নগরীয় কৃষির বাংলাদেশ। নগর পরিকল্পনায় কৃষিকে অন্তর্ভুক্ত করে নগরবাসীর প্রয়োজনীয় খাবার শাকসবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস, দুধ-ডিম উত্পাদন করতে হবে। সেসঙ্গে নগরের বাড়িঘরের ছাদে, রাস্তার দুই ধারে, সড়কদ্বীপে, অফিস-আদালতের অব্যবহূত জায়গায়, জলাশয়ের ধারে, কবরস্থান ও শ্মশানের খালি জায়গায় পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করে ঢাকাসহ দেশের সব নগরকে সবুজায়িত করতে হবে। যানজট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে নিতে হবে সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত পরিকল্পনা।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুত্ ও জৈবসার প্রস্তুতের ওপর গ্রহণ করতে হবে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প। প্রতিটি শহরের আশপাশের নদীনালা, খালবিলগুলোকে করতে হবে দখল ও দূষণ মুক্ত। যত দিন যাচ্ছে, নগরবাসীর সংখ্যা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচন, স্বাস্থ্যসেবা ও বেশি আয়ের আশায় এবং নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে বাড়িঘর হারিয়ে সর্বস্বান্ত মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে শহরের বস্তিগুলোয়। এভাবে নগরের জনসংখ্যা বাড়তে থাকবে। সে কথা মাথায় রেখেই নগরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে এবং সে অনুযায়ী সব উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে এখন থেকেই।
এ কারণে আমাদের নগর পরিকল্পনার দার্শনিক এবং কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। সুষম ও টেকসই নগরায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রথমেই নগরায়ন রূপকল্প বা লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে, যা মূলত নাগরিকবান্ধব এবং মৌলিক সেবাসমূহ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে রচিত হবে। তবে নগরবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত ও টেকসই নগর গড়া কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়।
n শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ,
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
