‘করবন্ধু’ কাউছ মিয়া

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২১, ২২:২৮

দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে কর দেওয়া পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী হাজি কাউছ মিয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের  (এনবিআর) কাছ থেকে এ পর্যন্ত ১৪ বার পুরস্কার পেয়েছেন। এবার তাকে বিরল সম্মানে ভূষিত করল অর্থ মন্ত্রণালয়। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে একমাত্র তাকেই সেরা করদাতার সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। কর প্রদানে সততা, আন্তরিকতা ও স্বপ্রণোদনার কারণে তাকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রাজস্ব ভবনে ৯০ বছর বয়সি হাজি কাউছ মিয়ার হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট, সনদ ও মানপত্র তুলে দেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম।

একমাত্র কাউছ মিয়াকেই কেন মুজিববর্ষের সেরা করদাতার মতো সম্মাননা দেওয়া হলো, তার কারণও ব্যাখ্যা করেন এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, তিনিই (কাউছ মিয়া) সেরা করদাতা—এ নিয়ে কারো কোনো দ্বিমতের অবকাশ নেই। সবাই স্বীকার করবেন, এই সিদ্ধান্ত যথার্থ ছিল। তিনি অন্য সবার চেয়ে আলাদা। এই বয়সেও তিনি ব্যবসায়ের কাজে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন। তিনি অনুকরণীয়।

৬৩ বছর ধরে সরকারকে কর দিয়ে আসা কাউছ মিয়া নাম-যশ অর্জন করেছেন            মূলত জর্দা ব্যবসায়ের (হাকিমপুরী জর্দা) মাধ্যমে। সরকার যে বার থেকে সেরা করদাতার সম্মাননা দিচ্ছেন, তখন থেকেই তিনি ব্যবসায়ী করদাতা হিসেবে শীর্ষে রয়েছেন। সরকারকে বিপুল পরিমাণ কর দিলেও তার কোনো ব্যাংক ঋণ নেই। সর্বশেষ কিছুদিন আগেও সরকার শীর্ষ করদাতাদের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের পেছনে ফেলে তিনিই শীর্ষে।

গতকাল সম্মাননা অনুষ্ঠানে আনন্দে উচ্ছ্বসিত কাউছ মিয়া বলেন, ‘আমি ৭১ বছর ধরে ব্যবসা করি। আজকের (গতকাল) মতো এত আনন্দ আর পাইনি। আপনারা সম্মানিত মানুষরা আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমার মনে আজ এত আনন্দ...! আমি ব্যবসা করেছি, সম্পদ হয়েছে। আল্লাহ দিয়েছে। সব সম্পদ কর ফাইলে দেখানো আছে। এর বাইরে কিছু নেই। এই বয়সে এসেও রাত ২টা-আড়াইটার আগে ঘুমাতে যেতে পারি না।’ কথায় রাখঢাক না রেখে একপর্যায়ে দর্শকদের উদ্দেশ্যে কিছুটা আবেগতাড়িত হয়েই বললেন, ‘এখন মাত্র ১০-১২টা ব্যবসা আছে। অনেক ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছি। তবে সম্পদ আমার হাতে এখনো আছে। আমার এত সম্পদ আছে, আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না। উত্তরাধিকারীদের বলেছি, তোমরা যার যার সম্পদ নিয়ে যাও।’

তবে ব্যবসায়ে আসা কিংবা বিপুল ধন সম্পদ অর্জনের আগেও তিনি পারিবারিকভাবে অবস্থাসম্পন্ন ছিলেন, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিতেও ভুললেন না। বললেন, পূর্বপূরুষরা ত্রিপুরার অধিবাসী ছিলেন। আমি সাত জন জমিদারের নাতি। ১৯১৭ সালে তারা ত্রিপুরার জমিদার ছিলেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে সরকারের দেওয়া সেরা করদাতার তালিকায় ব্যবসায়ী ক্যাটাগরিতে কাউছ মিয়ার নাম শীর্ষে চলে আসার পর আলোচনায় আসেন তিনি। একই সঙ্গে তামাকবিরোধী জোটগুলো একজন তামাক ব্যবসায়ীকে কেন সেরা করদাতার সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে সব ছাপিয়ে আলোচনা ওঠে—বিপুল আয় অর্জন করা শত শত কিংবা হাজার কোটি টাকার মালিকরা কেন তার জায়গায় আসতে পারেন না।

কাউছ মিয়া ১৯৩১ সালে চাঁদপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষরা তত্কালীন ত্রিপুরা রাজ্যের অধিবাসী ছিলেন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তার পড়ালেখায় ছেদ পড়ে। এরপর চাঁদপুর শহরে ব্যবসা শুরু করেন। এক সময় তিনি ১৮টি ব্র্যান্ডের বিস্কুট, সাবান ও সিগারেটের এজেন্ট হন। ২০ বছর চাঁদপুরে ব্যবসা করার পর ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জে এসে ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে পুরান ঢাকায় বসবাস করছেন। তিনি বিশেষভাবে পরিচিতি পান হাকিমপুরী জর্দার ব্যবসায়ের জন্য। এ পর্যন্ত কর প্রদানের জন্য রাজস্ব বিভাগ থেকে ১৪ বার বিভিন্ন ধরনের পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। ২০১৬ সালে পান কর বাহাদুর পরিবারের স্বীকৃতি।

ভ্যাট দিয়ে লটারি জিতলেন ১০১ জন 

পণ্য বা সেবা কেনার মাধ্যমে ভ্যাট পরিশোধ করা ভোক্তাদের লটারির মাধ্যমে পুরস্কারের অংশ হিসেবে গতকাল ১০১ জনের নাম ঘোষণা করেছে এনবিআর। রাজধানীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত ইএফডি মেশিনের মাধ্যমে ভ্যাট চালান নেওয়া ও তা জমা দেওয়া ভোক্তাদের মধ্য থেকে গত মাস থেকে ১০১ জনকে পুরস্কৃত করে আসছে এনবিআর। এর অংশ হিসেবে গতকাল রাজস্ব ভবনে দ্বিতীয় দফা লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হয়। এতে এনবিআর চেয়ারম্যান ছাড়াও ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই লটারির প্রথম পুরস্কার ১ লাখ টাকা। একই দিন ভ্যাট আদায় করে সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়ার মাধ্যমে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ায় ধানমন্ডির স্টার কাবারের মালিক মীর আক্তার উদ্দিনকেও সম্মাননা দেওয়া হয়। এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, নতুন পদ্ধতিতে মানুষকে অভ্যস্ত করা একটা চ্যালেঞ্জ। ইএফডি নিয়ে আমাদের অনেক আশা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। অনেক ভোক্তা এমনকি ব্যবসায়ীও জানেন না, ভ্যাট কী জিনিস। আবার বিক্রেতা চাইলেও ক্রেতা প্রতিক্রিয়া দেখান। আবার ভ্যাটের টাকা দিলে সরকার পাবে কি না, সে বিষয়েও সন্দেহ থাকে। ইএফডি ব্যবস্থায় ভ্যাট পরিশোধ করা হলে এ ক্ষেত্রে আস্থা তৈরি হবে।