১৯৭১ সালে দৈনিক ইত্তেফাক (৬ মার্চ)

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২১, ২০:৫৪

সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরুর পর থেকে ইত্তেফাক হয়ে ওঠে গণমানুষের মুখপত্র।  বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল পত্রিকাটি। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করে গেছে ইত্তেফাক। পত্রিকাটির এই ভূমিকা উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।

স্বাধীনতার মাস অগ্নিঝরা মার্চে দৈনিক ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭১ সালের ৬ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘বাংলার বুকে এ গণহত্যা বন্ধ কর!’। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদের বক্তব্য এটি। তার তথ্যানুযায়ী- ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেটসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে মিলিটারির গুলিতে নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষকে মেরে ফেলা হচ্ছে। সহসা এই নরহত্যা বন্ধের দাবি জানান তিনি। তার মন্তব্য, ‘নির্বিচারে নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ছাড়া আর কিছুই নয়।’

এক বিবৃতিতে তাজউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং বাংলাদেশকে পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্থবাদী মহলের উপনিবেশ ও বাজার হিসেবে শোষণের গুঢ় রাজনৈতিক মতলবে বেসামরিক অধিবাসীকে ভয়-ভীতি দেখাতেই সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু বিদেশি আক্রমণের মোকাবিলায় দেশরক্ষার জন্য সেনাবাহিনী তাদের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। নিরস্ত্র দেশবাসীর ওপর নয়।’

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার মানুষের হতাহত হওয়ার খবর এসে পৌঁছাচ্ছে। সেনাবাহিনীর এমন ঘৃণিত আচরণের তীব্র নিন্দা জানান তিনি। ইত্তেফাকের ৬ মার্চের প্রথম পাতায় প্রকাশিত খবরগুলোতে সেই সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন অষ্টম কলামে প্রকাশিত খবরের শিরোনাম, ‘চট্টগ্রামে ১৩৮ জন নিহত’।

প্রথম পাতার নিচের অংশে বাঁ-দিকে রাখা একটি খবরের শিরোনাম, ‘টঙ্গীতে গুলিবর্ষণে ৪ জন নিহত, ২৫ জন আহত’। টঙ্গীতে নিহতদের জন্য ছাত্রলীগের শোক মিছিলের খবর স্থান পায় ইত্তেফাকের প্রথম পাতায়। পূর্বাঞ্চলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের জন্য লাহোরে প্রধান প্রধান মসজিদে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ৬ মার্চের ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় ‘লাহোরে বিশেষ প্রার্থনা’ শিরোনামে উঠে এসেছে সেই খবর। ঢাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুরানা পল্টনে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম খোলার খবর জানানো হয় ইত্তেফাকের প্রথম পাতায়।

৬ মার্চের প্রথম পাতায় ‘কল্পনার ফানুস’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বক্তব্যকে শিরোনাম করা হয়। একটি বিদেশি সংস্থার বরাতে আকাশবাণী প্রচার করে, ভুট্টোর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ-বাটোয়ারা করতে রাজি আছেন শেখ মুজিব। এ প্রসঙ্গে তার মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি আকাশবাণীর খবরকে কল্পনার ফানুস হিসেবে আখ্যা দেন।

১৯৭১ সালের ৬ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার মাঝামাঝি বক্স করে জানানো হয়, আগামীকাল (৭ মার্চ) বিকাল ২টায় রেসকোর্স ময়দানে গণ-সমাবেশ। বক্তৃতা করবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ইত্তেফাকে এদিনের প্রথম পাতার একটি খবরে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রতি ১১ দফা আন্দোলনের অগ্রনায়ক তোফায়েল আহমেদের আহ্বান প্রকাশের শিরোনাম করা হয়, ‘শেখ মুজিবের ভাষণ রিলে করিতে হইবে’। এর পাশেই দেখা যায় স্বাধিকার আন্দোলনে ৬ মার্চের কর্মসূচির তালিকা। 

‘পিপিপি বলে কী!’ শিরোনামে ৬ মার্চ ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় একটি খবরে জানানো হয়, পাকিস্তান পিপলস পার্টির মুখপাত্র আব্দুল হাফিজ পীরজাদা ৫ মার্চ রাওয়ালপিণ্ডিতে বলেন, ‘জাতীয় পরিষদের অধিবেশ স্থগিত রাখার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া যেখানেই বিচার করা হোক না কেনো, অত্যন্ত অবাঞ্ছিত। এটি যুক্তিযুক্ত নয়।’ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও প্রধানমন্ত্রী ভুটো ৫ মার্চ বৈঠক করার পর পাকিস্তান পিপলস পার্টির মুখপাত্র সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। 

‘এই উত্তাল জোয়ারে’ শিরোনামের খবরে জানানো হয়, ঢাকায় ৫ মার্চ বিকালে নবীন-প্রবীণ কবি-সাহিত্যিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মিছিল করে রাজপথে নেমে আসেন। এরপর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে আপামর মানুষের সঙ্গে একাকার হয়ে স্বাধিকার সংগ্রামের পথে এগিয়ে যাওয়ার শপথ নেন। লেখক সংঘের পক্ষ থেকে এই মিছিল বের করা হয়। 

রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে ‘ডিফ্যাক্টো’ শিরোনামে সম্পাদকীয়র আদলে প্রকাশিত লেখায় পূর্ব পাকিস্তানের পুরো চিত্র তুলে ধরা হয় ইত্তেফাকের ৬ মার্চের প্রথম পাতায়। এতে বলা হয়, জনগণের মন্দের মন্দিরে বঙ্গবন্ধুর যে স্বীকৃতি মিলেছে সেটাই তাকে প্রকৃত প্রস্তাবে বাংলাদেশের ‘ডিফ্যাক্টো’ (অনানুষ্ঠানিক) প্রশাসকের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। জাতীয় পরিষদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা না হলেও বাংলার আপামর মানুষ তার হাতে এমনই ক্ষমতা তুলে দিয়েছেন যে, তার নির্দেশ ও প্রদত্ত ছক মেনেই রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে সরকারের সব বিভাগকে কাজ করতে হচ্ছে। বাংলার বুকে তার অঙ্গুলির নির্দেশ উপেক্ষা করার মতো শক্তি বা ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো সংস্থারই নেই, প্রাদেশিক সরকারের তো নাই-ই।

ইত্তেফাক/জেএইচ