জলঢাকার ১৩ শ্রমিক নিহতের ঘটনায় পরিবারে শোকের মাতম

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:০৭

নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার মিরগঞ্জ ইউনিয়নের পাঠানপাড়া ও শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের ঘুঘুমারী গ্রামের মোট ১৩ শ্রমিক কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ইটভাটায় কাজ করতে গিয়ে নিহত হন। নিহতদের মধ্যে উপজেলার মিরগঞ্জ ইউনিয়নের ৯ জন ও শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের ৪জন রয়েছে। উপজেলার মিরগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. হুকুম আলী ও শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হামিদুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তাদের সকলের বাড়ি নীলফামারীর জলঢাকায়।

শুক্রবার (২৫ জানুয়ারি) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গোলপাশা ইউনিয়নের নারায়নপুর এলাকায় ব্রিক ফিল্ডে কয়লা ভর্তি ট্রাক উল্টে ঘটনাস্থলে নিহত হন এই ১৩ শ্রমিক।

পারিবারিক সূত্রে জানায়, ১৫ দিন আগে তারা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ইটভাটার কাজের জন্য যান। শুক্রবার ভোরবেলা কয়লা ভর্তি একটি ট্রাক আনলোড করার সময় ঘুমন্ত সেটের ওপর উল্টে পড়ে। তখন ঘটনাস্থলে ১২ জন ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন নিহত হন।

জলঢাকার ১৩ শ্রমিক নিহতের ঘটনায় পরিবারে শোকের মাতম। ছবিঃ ইত্তেফাক।

এলাকাবাসী বলছেন, নিহতরাই ছিলেন পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ওই দুই ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোতে বুকফাটা কান্নার রোল। মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। তাদের আহাজারিতে প্রকম্পিত হচ্ছে আকাশ-বাতাস।

সরেজমিনে, শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের ঘুঘুমারী গ্রামের নিহত দিপু চন্দ্র রায়ের বাবা অমল চন্দ্র রায় বুক চাপড়ে বলেন, ‘মোর বাবার কামের টাকা দিয়া মুই ঔষুধ পত্র খাও, আইজ থাকি মোর ঔষুধ খাওয়া বন্ধ হইলো।’

ওই ইউনিয়নের নিহত কনক চন্দ্র রায়ের মেয়ে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী বর্ণা রানী বলেন, ‘বাবা মরার আগের দিন খাতা কেনার টাকা চাইছিনু। কিন্ত আজ হঠাৎ শুনি বাবা আর নেই!’ বর্ণার ছোট ভাই কৌশিক রায় দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। তাদের দুজনের কান্নায় বাক প্রতিবন্ধী দাদু ধৈলু রায় ছেলেকে হারিয়ে পাগলের প্রলাপ বকছেন। ফ্যালফ্যাল করে দেখছে আর কি যেন বলছে!

একই এলাকার দশম শ্রেণির ছাত্র নিহত মনোরঞ্জন ও নিহত নবম শ্রেণির ছাত্র মৃনাল রায় লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে দুজনে কুমিল্লার ইটভাটায় কাজ করতে যায়। তাদের লেখাপড়া শিখে বড় হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। এই দুর্ঘটনায় অকাল মৃত্যুতে দুই পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। মৃনালের ভাই সুনিল চন্দ্র রায় বলেন, ‘প্রায় ১৬-১৮ দিন আগে সে কাজে যায়। ভাই আমাদের মাঝে নেই বিশ্বাস হচ্ছে না।’

জলঢাকার ১৩ শ্রমিক নিহতের ঘটনায় পরিবারে শোকের মাতম। ছবিঃ ইত্তেফাক।

শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকায় যারা দুর্ঘটনায় মারা গেছে, তারা একেবারেই দিনমজুর। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের কাছে দুর্ঘটনার বিষয়টি জানানো হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘পরিবারগুলো পথে বসলো। তারা সরকারী সহযোগিতা পেলে উপকৃত হতো। আর সৎকারের জন্য স্থানীয়ভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে।’

নিহতরা হলেন, জলঢাকা উপজেলার মিরগঞ্জ ইউনিয়নের নিজ পাড়া গ্রামের সুরেস চন্দ্র রায়ের ছেলে রঞ্জিত কুমার রায় (২৯) একই উপজেলার পাঠান পাড়া গ্রামের নূর আলমের ছেলে মো. মোরছালিন (১৮), ফজলুল করিমের ছেলে মো. মাসুম (১৯) নিজপাড়া গ্রামের মানিক চন্দ্র রায়ের ছেলে তরুন চন্দ্র রায় (২৪) একই গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে মো. সেলিম (২৭) রামপ্রসাদের ছেলে বিপ্লব চন্দ্র (২০), রাজবাড়ী গ্রামের খোকা চন্দ্র রায়ের ছেলে বিকাশ চন্দ্র রায় (২৮) একই গ্রামের ধলু রায়ের ছেলে কনক চন্দ্র রায় (৩৩)। একই উপজেলার দিনেশ চন্দ্র রায়ের ছেলে মৃনাল চন্দ্র রায় (২৩)। 

আরও পড়ুনঃ শ্রীপুরে স্বামীকে ৬ টুকরা করে হত্যা, স্ত্রীসহ আটক ২

এদিকে, উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের উত্তর ঘুঘুমারী গ্রামের মনোরঞ্জন রায় (১৯), কিশোর চন্দ্র রায়ের ছেলে শংকর চন্দ্র রায় (২১), অমল চন্দ্র রায়ের ছেলে দিপু চন্দ্র রায় (২০) কামুক্ষা রায়ের ছেলে অমৃত চন্দ্র রায় (২০)।

ইত্তেফাক/নূহু