জনদুর্ভোগ লাঘবে প্রয়োজন কড়া নজরদারি

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২১, ২১:৫০

আগামী পহেলা বৈশাখে এবার পবিত্র রমজান শুরু হচ্ছে। করোনা অতিমারির কারণে জাতীয় পর্যায়ের সব অনুষ্ঠানই বিগত এক বছর ধরে বর্জন করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। একদিকে করোনা, অন্যদিকে রমজানকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী বাজারে প্রতিটি পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেন। বিশেষ করে সেই সব পণ্য, যেগুলো রোজাদারেরা মূল্য বাড়লেও কিনতে বাধ্য হয়। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় বহু লেখালেখি, আলোচনা-সমালোচনা করেও কোনো লাভ হয়নি। প্রায় এক বছর ধরে কোভিড ১৯ অতিমারি ব্যক্তি পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে। করোনার কারণে বিশ্বের অনেক দেশেই অর্থনৈতিক সংকোচন ঘটেছে। প্রবৃদ্ধি বাড়ার পথ রুদ্ধ হয়েছে। কলকারখানা, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। একটা বিরাটসংখ্যক জনগোষ্ঠী বেকার, যাদের কর্মসংস্থান ছিল। মিল-কারখানাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনার কারণে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে। দারিদ্র্যের কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। করোনা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য অভিশাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। যাদের আয় কমে গেছে, তারা যে কী পরিমাণ আর্থিক দুর্দশায় পড়েছেন তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আর্থিক দৈন্যতার মধ্যে তাদের দৈনন্দিন জীবন নির্বাহ করছে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দাকেও তা ছাড়িয়ে যাবে। করোনার কারণে ৫০ কোটি লোক নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়বে। বিশ্বব্যাপী ৩৩০ কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়তে পারে। এই যখন অবস্থা, তখন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে বিরাটসংখ্যক জনগোষ্ঠী কতটা বিপাকে পড়তে পারে, তা কি আমাদের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় একবারও ভেবে দেখেছে?  দেশে বাজার ব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য হল, একবার যে পণ্যের মূল্য বাড়ে, সেটি আর কমতির দিকে সহজে আসতে চায় না। বিরাট একটা সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। রোজা শুরুর এখনো মাসাধিক সময় বাকি, তার আগেই অতিপ্রয়োজনীয় ১১টির বেশি পণ্যের মূল্য ব্যবসায়ীরা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন। সরকার ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করে দিলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে। এটা শুধু এ বছরই নয়, দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলে আসছে, কিন্তু এর কোনো প্রতিকার দেখতে পাচ্ছি না। বাজার শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ  করতে না পারলে, অর্থাত্ বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে এ অবস্থা যুগ যুগ ধরে চলতেই থাকবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় বাজার নিয়ন্ত্রণের নামে তদারকি কার্যক্রম চালালে তারা পণ্যের দাম কমানো দেখালেও প্রকৃত অর্থে তারা এত বেশি দাম বাড়ায় যে মুনাফার একটা বড় অংশ হাতে রেখে নামমাত্র মূল্য কমানো দেখায়। এতে ভোক্তারা মোটেও উপকৃত হয় না। বাজারে গেলে অনেক সময় দেখতে পাই ‘বিরাট মূল্যহ্রাস চলছে’। আসলে পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দাম বাড়িয়ে দেখায় যে দাম কমানো হয়েছে। এটা ধোঁকাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। যারা তাদের এই কারসাজি বুঝতে পারে না, তারা ঠকে যায়। কঠোর নজরদারি ছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এ দেশের খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। বেঁচে থাকার জন্য চাল, ডাল, তেল, নুন কিনতেই যদি নাভিশ্বাস ওঠে; তাহলে জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনীয় ওষুধ, ডাক্তার বা হাসপাতালের বিল পরিশোধ হবে কী দিয়ে? করোনা মহামারির চিকিত্সাই বা হবে কীভাবে? হ্যাঁ, এটা সত্যি যে আমাদের আয় বাড়ছে, ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু কাদের বেড়েছে? কোন শ্রেণির মানুষের বেড়েছে? যেটুকু বেড়েছে, সেটুকু যদি বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ক্রয় করতে শেষ হয়ে যায়, তাহলে চিকিত্সা, শিক্ষা, বাড়িভাড়া, পানি, বিদ্যুত্সহ এসবের ব্যয় নির্বাহ করার জন্য অপরিহার্য যেসব দ্রব্য প্রয়োজন, সেগুলোর ব্যয় নির্বাহ হবে কীভাবে? পবিত্র রমজান মাসে সারা দিন রোজা রাখার পর একটু ভালোমন্দ কে না খেতে চায়? একটু ভালো ইফতার, সেহরির সময় মাছ-মাংস-ডিম-দুধ; অর্থাত্ একটু পুষ্টিকর খাবার না খেতে পারলে রোজা রাখবে কী করে? যাদের চুরি করার সুযোগ আছে, তারা হয়তো সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। কিন্তু যাদের কোনোই উপায় নেই, তারা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বাড়তি অর্থ গুনতে গিয়ে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। রমজান মাসেও যদি এরকম অবস্থা থাকে, তাহলে রোজাদারেরা ভীষণ অসুবিধায় পড়বেন। রমজান এবং ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রায় কাছাকাছি সময়ে আসায় এর প্রভাবটা একটু বেশিই পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রমজানের দুই মাস বাকি থাকতেই ভোজ্যতেল ও চিনির মূল্য অস্বাভাবিক বেড়েছে। আগামী বাজেটে কোন কোন পণ্যের মূল্য বাড়বে বা কমবে, সেটি না জানলেও বাজেট ও রমজান সামনে রেখে এখন থেকেই ব্যবসায়ীরা তত্পর হয়ে গেছেন। ধর্মীয় কোনো অনুভূতি তাদের মধ্যে কাজ করে না, করলে রমজান মাসে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের কষ্ট দিতেন না। ভোক্তা অধিকার আইনও এক্ষেত্রে কোনো কাজ করে না। এ ছাড়াও এত উচ্চমূল্য দিয়ে আমরা যেসব খাবার কিনে খাচ্ছি, তার প্রায় ৯০-৯৫ ভাগই ভেজালে ভরা বিষাক্ত সব খাদ্য। এমন কোনো খাদ্য নেই, যেখানে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে না। বেঁচে থাকার জন্য খেতে হয়। ভেজাল, নোংরা, পচা-বাসি খাদ্য চমত্কৃত মোড়ক লাগিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। আমরাও জেনেশুনে বিষ পান করছি। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই অশিক্ষিত। শিক্ষার আলো না থাকায় মানবতাবোধ তাদের মধ্যে কাজ করে না। অর্থলোভী মুনাফাখোরেরা নিজের স্বার্থের জন্য মানুষকে বিষাক্ত খাবার খাওয়াতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। শিক্ষার আলো থাকলে তারা মানবতাবোধহীন কাজ কখনো করতে পারত না। সরকার মাঝে মাঝে মোবাইলকোর্ট বসিয়ে এসব অর্থলোভী পিশাচের চেহারা উন্মোচন করলেও কিছুদিন পরেই আবার তারা স্বরূপে ফিরে আসে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-অধিদপ্তরের স্বল্পসংখ্যক লোকবল দিয়ে এত বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া যেটুকু জনবল আছে, তাদের অনেকেই অর্থের লোভে নীতিনৈতিকতাবর্জিত কাজ অহরহ করে যাচ্ছে। অর্থের কাছে তারা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এভাবেই দুর্নীতি আমাদের আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলছে। এর থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে জিডিপি কিংবা মাথাপিছু আয় যতই বাড়ুক, তাতে কোনো লাভ হবে না। সরকারকে শক্ত হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। তা করতে না পারলে সরকার দুর্নীতিকে শূন্যসহনীয় বা জিরো টলারেন্স অবস্থায় আনার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেও এই পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন ঘটবে না। কাজেই আর দেরি না করে এই করোনাকালে কড়া নজরদারির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে একটু শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেবে, বর্তমান সদাসয় সরকারের কাছে এটাই সবার প্রত্যাশা।  

n লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক