পিতামাতার স্নেহবঞ্চিত শিশুদের বিকল্প পরিচর্যার আদর্শ মডেল ‘ফ্যামিলি লাইক কেয়ার’কে দেশের সংশ্লিষ্ট আইনের বিধিমালার মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, চলমান মুজিববর্ষে মডেলটিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হলে সেটি হবে মাইলফলক, যার মাধ্যমে দেশে বিভিন্ন সংস্থায় বেড়ে ওঠা পিতামাতাহীন শিশুরা পাবে পরম যত্ন, মমতা এবং পারিবারিক পরিবেশের নিশ্চয়তা। গতকাল মঙ্গলবার কাওরান বাজারে দৈনিক ইত্তেফাক কার্যালয়ে মজিদা বেগম মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তারা এ কথা বলেন।
“পিতামাতার স্নেহবঞ্চিত শিশুদের মানসম্মত বিকল্প পরিচর্যা পদ্ধতি ‘ফ্যামিলি লাইক কেয়ার’-এর আইনগত স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা” শীর্ষক এই বৈঠকের আয়োজন করে এসওএস শিশুপল্লী। আয়োজনের মিডিয়া পার্টনার ছিল দৈনিক ইত্তেফাক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, ‘আজকের এই বৈঠকে এসওএস শিশুপল্লীর একজন মা ও একজন মেয়ের বক্তব্য শুনে যে অনুভূতি তৈরি হলো, সেই সুখানুভূতি দেশের প্রতিটি পিতামাতাহীন শিশুও পেতে পারে, যদি আইনে আমরা মডেলটি অন্তর্ভুক্ত করে দিতে পারি। প্রধানমন্ত্রীও এই আইনকে স্বাগত জানাবেন। কারণ তার মধ্যে শিশুদের জন্য সেই মমত্ববোধ রয়েছে।’
বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিশেষ অতিথি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, এটা জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ। এই সময়ে মডেলটি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হলে সেটি হবে একটি মাইলফলক। ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে অপর বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিশু অধিকারবিষয়ক সংসদীয় ককাসের সভাপতি ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু বলেন, ‘এসওএস শিশুপল্লীর মডেলটি চমত্কার। সংসদীয় ককাসের পক্ষ থেকে আমরা এটিকে সমর্থন জানাই।’
সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে দৈনিক ইত্তেফাক ও পাক্ষিক অনন্যার সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, “আমাদের দেশটা ছোট, কিন্তু লোকসংখ্যা বেশি। সমাজে পরিত্যক্ত শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনের কারণ দারিদ্র্য। সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবাইকে এ নিয়ে কাজ করতে হবে। এসওএস শিশুপল্লীর মডেলটি দারুণ। ‘পরিত্যক্ত শিশু সুরক্ষা আইনে’ এসওএস শিশুপল্লীর মডেলটি অন্তর্ভুক্ত হোক। আমি মনে করি, শিশুদের পরিবারের পাশাপাশি তারা যেন জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে পারে, সেজন্য তাদের কারিগরি ট্রেনিং দিতে হবে। আশা করব নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এই রিসোর্সকে তৈরি করতে পারবে।”
‘ফ্যামিলি লাইক কেয়ার’-এর যারা মধ্যমণি এবং যাদের স্নেহ-ভালোবাসায় শিশুরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন, তারা হচ্ছেন ‘এসওএস মা’। তেমনি একজন মা সাবেরা সুলতানা। তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকা সোনালী ঘরের মা। ১৬ বছর এই পল্লীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার। আমি যখন পরিবারের দায়িত্ব নিই, তখন আমার পরিবারে আট সন্তান ছিল। সেখান থেকে দুটো মেয়ে আমার এমবিএ শেষ করেছে, দুটো অনার্সে পড়ছে, বাকিগুলো ইন্টারমিডিয়েটে পড়ছে, কেউবা অনার্সে ভর্তি হবে। বিভিন্ন উত্সবে আমার সন্তানেরা আসে, আমার জন্য উপহার আনে। আমি এখন নানিও হয়েছি। আমার সন্তানেরা আমাকে সত্যি সত্যিই মায়ের মতো করেই দেখে।’
এসওএস শিশুপল্লীর কার্যক্রম এদেশে ১৯৭২ সালে শুরু হয়েছিল। এ পর্যন্ত দেশের সাতটি জেলায় প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রকল্পের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার উপকারভোগী নিরাপত্তা পাচ্ছেন এবং সরাসরি ১ হাজারের বেশি শিশু লালিত-পালিত হচ্ছে।
ঢাকা ‘কাকলী পরিবারে’ বেড়ে ওঠা মেয়ে ফাতেমা আক্তার বলেন, “আমি ছয় বছর বয়সে এই পরিবারে আসি। তার আগে ‘পুবাইল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে ছিলাম। এই পরিবারের আমি এত ভালোবাসা পেয়েছি যে, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত জানতাম না এই মা, ভাইবোন আমার নিজের না। আমি যখন পল্লীর মাকে জিগ্যেস করেছিলাম, ‘আমি তোমার মেয়ে, তাহলে আমাকে অন্যখানে রেখেছিলে কেন? মা উত্তরে বলেছিলেন, দেখো না, তোমার অনেকগুলো ভাইবোন, ওরা ছোট ছিল, এখানে আনলে তোমার কষ্ট হতো, তাই কিছুদিনের জন্য অন্যখানে তোমাকে রেখেছিলাম।”
এসওএস শিশুপল্লীর সহকারী পরিচালক নুসরাত জাহান বলেন, ‘আমাদের এখানে একটি পরিবারে একজন মায়ের ১০ জন ছেলেমেয়ে থাকে। শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। মানসম্মত শিক্ষা, কর্মমুখী শিক্ষা এবং এক্সট্রা কারিকুলাম শিক্ষা দেওয়া হয় প্রতিটি শিশুকে।’
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন এসওএস শিশুপল্লীর জাতীয় পরিচালক মো. এনামুল হক। এতে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য উম্মে ফাতেমা নাজমা, অপরাজিতা হক, আবিদা আনজুম মিতা, সৈয়দা রুবিনা আক্তার, রেজাউল করীম ও তামান্না নুসরাত বুবলী এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এম এম মাহমুদুল্লাহ, একই মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. সাইফুল ইসলাম, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শিশু সমন্বয়ক উইংয়ের কর্মকর্তা মো. মুহিবুজ্জামান। সমাপনী বক্তব্য রাখেন এসওএস শিশুপল্লীর প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলাম। বৈঠক সঞ্চালনা করেন আহমেদ মেহেদী হাসান।
