অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অপেশাদার চালক আর নহে

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:০৪

সম্প্রতি রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে অনুষ্ঠিত ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভায় পরিবহন মালিকরা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অপেশাদার চালককে দায়ী করিয়াছেন। কিন্তু প্রশ্ন হইল, এই অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অপেশাদার লোকদের হাতে জানিয়া, শুনিয়া ও বুঝিয়া গাড়ির স্টিয়ারিং তাহারা তুলিয়া দিতেছেন কিভাবে? ইহা কি তাহাদের এই ্বক্তব্যের স্ববিরোধিতা নহে এবং এইজন্য কি তাহারা নিজেরাই দায়ী নহেন? পরিবহন মালিক ও নিয়োগদাতা হিসাবে তাহারা ইহার দায়-দায়িত্ব কিছুতেই এড়াইতে পারেন না। তাহাদের লাইসেন্স আছে কি নাই, তাহা এখানে বিবেচ্য বিষয় নহে। বালক বা শিশুদের হাতে লক্ষ লক্ষ টাকার গাড়ি ছাড়িয়া দেওয়া হইতেছে কোন যুক্তিতে? কেহ কেহ আবার বলিয়া থাকেন যে, তাহারা অপ্রাপ্তবয়স্ক হইলেও তাহাদের হালকা লাইসেন্স আছে। লাইসেন্স আবার হালকা হয় কী করিয়া তাহাও আমাদের বোধগম্য নহে।

পরিবহন মালিকরা চাহিলেই প্রাপ্তবয়স্ক, দক্ষ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক নিয়োগ দিতে পারেন। কিন্তু একশ্রেণির পরিবহন মালিক তাহা করিবেন না। কারণ ইহাতে কম বিনিয়োগে বেশি লাভের মওকা আছে। শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সম্মুখে সেই কলেজেরই দুই শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর সারাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের তুমুল আন্দোলন গড়িয়া ওঠে। এই আন্দোলন হইতে আমরা আসলে কেহই শিক্ষা গ্রহণ করি নাই। এখানে একাদশ শ্রেণির যে ছাত্রীটি নিহত হয়, তাহার নাম দিয়া খানম। তাহার বাবা স্বয়ং পেশায় ছিলেন একজন দীর্ঘ রুটের বাসের ড্রাইভার বা চালক। তিনি তাহার এক সাক্ষাত্কারে বলেন যে, পরিবহন মালিকরা অধিক লাভের স্বার্থে কম মজুরি বা বেতন দিয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক-হেলপার রাখিবার প্রতিই অধিক মনোযোগী। আর এই সীমাহীন লোভেরই বলি হইতেছে সাধারণ মানুষ। অবশ্য এইক্ষেত্রে পরিবহন মালিকরা যে যুক্তি দেখান তাহাও এখানে প্রণিধানযোগ্য। তাহাদের মতে, ২০১০ সালে ঘোষিত শিল্পনীতি অনুযায়ী সড়ক পরিবহন খাত সেবাশিল্প হিসাবে স্বীকৃত পাইলেও বাস্তবে তাহার কোনো কার্যকারিতা নাই। এই খাত যদি সেবাশিল্পই হয়, তাহলে রুট পারমিট, ট্যাক্স-টোকেন, ফিটনেস ও রেজিস্ট্রেশন খাতে কর ও ফি দেওয়ার পরও ১৫ শতাংশ ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর দিতে হইবে কেন? অর্থাত্ তাহারা বলিতে চাহিতেছেন, এই খাতে ব্যয় অত্যধিক বলিয়াই তাহারা কম বেতনের অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক রাখিয়া থাকেন।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শতকরা ১৫ ভাগের মতো চালকের দক্ষতা বা প্রশিক্ষণ আছে। আর তাহাদের শতকরা ৩৫ ভাগের বয়স ১৫ বত্সরের নিচে। তাহার উপর চালকরা ট্রিপ ভিত্তিতে গাড়ি চালাইতে বাধ্য হওয়ায় যত ট্রিপ তত আয়ের জন্য তাহাদের বেপরোয়া মনোভাব দিন দিন বাড়িতেছে। তাহাদের শ্রমঘণ্টা নির্দিষ্ট না হওয়ায় অমানুষিক পরিশ্রমের পর বিশ্রামের অভাবেও ঘটিতেছে নানা দুর্ঘটনা। মোটকথা, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অপেশাদার চালক সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান একটি কারণ। এই প্রবণতা হইতে আমাদের অবশ্যই বাহির হইয়া আসিতে হইবে। আশার কথা হইল, পরিবহন মালিকরা অদক্ষ চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করিবার প্রস্তাব দিয়াছেন। ইহা নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু তাহারা অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক নিয়োগ দিবেন না আর কখনো—এমন কোনো অঙ্গীকার করেন নাই। এইক্ষেত্রে তাহাদের আন্তরিকতা, সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা একান্ত কাম্য।