দেশে করোনার প্রকোপ শুরুর পর গত বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ২০ শতাংশ প্রবাসী শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে ৫ শতাংশ বিভিন্ন কারণে দেশে ফিরে এসেছেন। কর্মসংস্থান ও অভিবাসনের ওপর মহামারির প্রভাব শীর্ষক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের করা ঐ জরিপে বলা হয়েছে, বেতন না পাওয়া বা কম বেতন পাওয়া, বাসা ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ করতে না পেরে চাকরি হারানো ৪৯ শতাংশ কর্মজীবী শহর থেকে গ্রামে চলে গিয়েছিলেন। তবে তারা আবার শহরে ফিরে কাজে যোগ দিয়েছেন বা কাজ খুঁজতে এসেছেন। তবে কাজ হারানোর মধ্যে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ জানিয়েছেন তারা কাজ ফিরে পান নি। ৫ দশমিক ৪ শতাংশ জানিয়েছেন তারা পেশা পরিবর্তন করেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার জরিপের ফলাফল নিয়ে একটি ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওয়েবিনারে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন সানেমের গবেষণা পরিচালক ড. সায়মা হক বিদিশা। ওয়েবিনারটি পরিচালনা করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর কান্ট্রি ডিরেক্টর টুমো পওতিয়ানেন। আলোচনায় অংশ নেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) এর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু) এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার ড. তাসনিম সিদ্দিকী এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
জরিপের ফলাফল উপস্থাপনের সময় ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, কর্মসংস্থান ও অভিবাসনের ওপর করোনা মহামারির প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পেতে সানেম ২০২১ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে খানা পর্যায়ে জরিপটি পরিচালনা করেছে। মোবাইল ফোন কলের মাধ্যমে পরিচালিত এই জরিপের খানাগুলোকে নির্বাচন করা হয়েছে ২০১৮ সালের সানেম-জেনারেল ইকোনমিক ডিভিশন (জিইডি)-এর পরিচালিত ১০৫০০ খানার মধ্যে থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, বেতন বা মজুরির বিনিময়ে যারা কাজ করেন এমন ৬২ শতাংশ কর্মী বা শ্রমিক জানিয়েছেন ২০২০ সালের মার্চ-ডিসেম্বর মাসের মধ্যে তাদের বেতন ২০১৯ সালের তুলনায় কমেছে। ৭ দশমিক ৯ শতাংশ জানিয়েছেন তারা কাজ ফিরে পাননি। ৫ দশমিক ৪ শতাংশ জানিয়েছেন তারা পেশা পরিবর্তন করেছেন। স্বকর্মসংস্থানে নিয়োজিত এমন ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন তাদের আয় কমে গিয়েছে, ২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন এই সময়কালে তাদের কাজ বা ব্যবসা একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মজুরির বিনিময়ে কাজ করেন এমন ৭ শতাংশ পুরুষ জানিয়েছেন ২০২০ সালের মার্চ-ডিসেম্বর মাসে তারা কাজ হারিয়েছেন এবং এখন পর্যন্ত তারা কাজে যোগ দিতে পারেননি, নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ১৬ শতাংশ।
কৃষি খাতে বেতন বা মজুরির বিনিময়ে কাজ করেন এমন ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন তাদের আয় কমে গিয়েছে, তৈরি পোশাক খাতের জন্য এই হার ৬৯ শতাংশ, অন্যান্য ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের জন্য এই হার ৫৮ শতাংশ, নির্মাণ খাতের জন্য ৭৪ শতাংশ, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায় ৫৭ শতাংশ এবং পরিবহন খাতের ৮০ শতাংশ।
শহর এলাকায় বেতন বা মজুরির বিনিময়ে কাজ করতেন এমন ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন ২০২০ সালের মার্চ-ডিসেম্বর সময়কালে তারা কাজ হারিয়েছেন এবং এখনো বেকার রয়েছেন, গ্রামের ক্ষেত্রে এই হার ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। বরিশালে এই হার ১৩ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১০ শতাংশ, ঢাকায় ৮ শতাংশ, খুলনায় ৩ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৮ শতাংশ, রাজশাহীতে ৫ শতাংশ, রংপুরে ১০ শতাংশ এবং সিলেটে ৭ শতাংশ।
ড. সেলিম রায়হান বলেন, বালাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তীর্ণ হলেও, আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। মহামারির আগে থেকেই বেসরকারি বিনিয়োগ, বিদেশি বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি স্লথ ছিল। কোভিড-১৯ এই সমস্যাগুলো আরো তীব্র করেছে। পুঁজিবাজার বা শ্রম বাজারের পুনরুদ্ধারের জন্য নীতি নেই বললেই চলে, বা থাকলেও তেমন প্রভাবশালী নয়। ফলে, সার্বিক পুনরুদ্ধার তেমন শক্তিশালী নাও হতে পারে।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, এটা ইতিবাচক যে, লোকজন ধীরে ধীরে কাজে ফিরে যাচ্ছে, কিন্তু যদি নতুন বিনিয়োগ না হয়, তাহলে শ্রমশক্তিতে যোগ হওয়া নতুন মানুষদেরকে আমরা কীভাবে জায়গা দেব, যেখানে আমরা আগের থেকেই বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য এখনো তেমন কিছু করতে পারিনি? তিনি আরো বলেন, অভিবাসন বন্ধ থাকার পরেও রেমিট্যান্স যেহেতু বৃদ্ধি হয়েছে, ফলে রেমিট্যান্স এবং অভিবাসনের যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক সেটি বাতিল হয়ে যাচ্ছে। দেশ থেকে বিদেশে বিনিয়োগের জন্য যে টাকা চলে গিয়েছিল, রেমিট্যান্সের মধ্যে সেটি আসছে কি না, তা বিবেচনা করা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি। ড. তাসনীম সিদ্দিকি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সংসদ সদস্যরা নিজেদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে শহর থেকে গ্রামে ফেরা হাজার হাজার অভিবাসীদের সাহায্য করেছেন, কিন্তু সরকারি কোনো সাহায্য বরাদ্দ হয়নি। অনেক পরিবারই যারা অভিবাসনে আগ্রহী ছিল তারা রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে গড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা দিলেও বিদেশে যেতে পারেনি। মার্চ থেকে ডিসেম্বরে ৪ লাখ শ্রমিক ফিরে এসেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই নিঃস্ব হয়ে; গড়ে এই শ্রমিকরা বিদেশে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ফেলে এসেছেন।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারের কাছে তথ্য-উপাত্তের অভাব থাকায় জনগণের কোনো অংশের সবচেয়ে সাহায্য দরকার এবং কীরকম সাহায্য দরকার তা চিহ্নিত করা কঠিন। আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর টুমো পওতিয়ানেন বলেন, আমরা যতই শক্তিশালী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার চাই না কেন, বৈশ্বিক শ্রম বাজার, ভোগ এবং বাণিজ্য সম্পর্কে কোনো কার্যকরী ভবিষ্যদ্বাণী করার সুযোগ নেই।
