অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নদীদূষণ

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:০৯

বেকারত্ব দূরীকরণ ও দেশকে স্বাবলম্বী করতে শিল্পের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু শিল্পের বর্জ্যই আবার নদীদূষণের কারণ। নদীর পাশে শিল্প স্থাপন অনেক দিক থেকে সুবিধাজনক। লেকালয় থেকে দূরে, কাঁচামাল পরিবহনে স্বল্প ব্যয়, গভীর রাতে মানুষের অসুবিধা সৃষ্টি না করে উত্পাদন অব্যাহত রাখা ইত্যাদি ছাড়াও গ্রামীণ এলাকা থেকে সুলভে শ্রমিক লাভ একটি উল্লেখযোগ্য দিক। কিন্তু সবকিছুর একটি সর্বোচ্চ বহন ক্ষমতা আছে। তার বাইরে গেলে তার কুফল অবশ্যম্ভাবী।

বুড়িগঙ্গার পাশ দিয়েও শিল্পায়ন হয়েছে। এমনিতেই ঢাকা মহানগরীর প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ মানুষের গৃহস্থালি, শক্ত এবং মেডিক্যাল বর্জ্যের গন্ধ, রং ও আয়তনে নদীর স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে নষ্ট করে ফেলেছে। অতিরিক্ত শিল্প স্থাপনের ফলে নদীর আয়তন সংকুচিত, জলপ্রবাহ বিঘ্নিত এবং পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর মৃত্যু এর আরেক দিক। সর্বশেষ যোগ হয়েছে সাভার ও ধামরাইয়ে বংশী নদীতে ঢাকা থেকে স্থানান্তরিত হাজারীবাগের ট্যানারিশিল্প। শিল্পের বর্জ্য প্রধান দূষণকারী হিসেবে কাজ করলেও শক্ত বর্জ্য, বোতল, টায়ার টিউব, পরিত্যক্ত কাঁচামাল, আলকাতরা, জ্বালানি তেল, কাপড় ধোয়ার ময়লা, তারকাটা, পেরেক, কাঠ, পলিথিন, টুকরো কাপড়, খাবার ইত্যাদির ময়লা নদী দূষিত করেছে। এর চাপ ও প্রভাব ক্রমে ঢাকার দূরবর্তী নদীপথেও যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন নদীর ক্রমশ মৃত্যুর দিকে যাত্রার কাহিনি।

বাংলাদেশে ৫৬ হাজার বর্গমাইলে ১৭ কোটি মানুষের চাপ প্রবল বিরূপ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। পরিবেশ তার অন্যতম ক্ষেত্র। নানারকম শিল্প স্থাপন নদীর স্বাস্থ্য, লাবণ্য এবং শেষ পর্যন্ত নদীর আয়ুকে শেষ করে দিচ্ছে। শিল্প কারখানা নদীর পানিকে দূষিত করে ফেলেছে। ইটিভি বা এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান অধিকাংশ শিল্পে না থাকায় উত্পাদনে ব্যবহূত পানি নানা রাসায়নিক উপাদানে দূষিত হয়ে সরাসরি নদীতে পড়ছে। ঢাকা ও বড় বড় শহরে তা প্রবল হওয়াতে দৃশ্যমান, বাইরের স্থানগুলিতে তা আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হচ্ছে। আমরা কোনো কিছু চরমে না উঠলে তাতে মনোযোগ দেই না।

যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ মৃতপ্রায়। চট্টগ্রাম ও মফস্বলের অনেক নদীর কথাও এমনতর শোনা যাচ্ছে নানা নাগরিক আন্দোলনের ফলে। মুনাফা কম হবে বলে শিল্প মালিকরা ইটিভি খুব একটা করবেন না। এই আইন বলবত্ করার সামর্থ্য অর্জন করা এক অলীক কল্পনা। তাছাড়া সামগ্রিক দুর্নীতির কারণে পরিবেশ আইন বলবত্ করা কারো পক্ষেই মূলত সম্ভব নয়। স্লোগান দিয়ে নদীর ময়লা পানিতে কান ধরে উঠে বসে বা দু-একবার অভিযান চালিয়ে নদী রক্ষা করা যাবে না। সকালে ফুটপাত দখলমুক্ত হলে বিকেলে যেমন বেদখল হয়, এও তেমনি হবে এবং হচ্ছে। মূল কথা—শিল্পের চাপ বেশি, স্থান ও সম্পদ কম। তাই অনুপ্রবেশ ঘটবেই। এখন প্রয়োজন নদী তীরে যত্রতত্র শিল্প স্থাপন নিষিদ্ধ করা। নতুন নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য সরকার প্রায় প্রতি জেলাতেই শিল্প নগরী, শিল্পাঞ্চল, শিল্পপার্ক নির্ধারণ করে দিয়েছেন। শিল্পদ্যোক্তারা নিয়ম-নীতি মেনে যদি নতুন নতুন শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেন, তাহলে একদিকে আমাদের দেশের বিপুল সংখ্যক বেকার জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। অন্যদিকে অপরিকল্পিত শিল্প স্থাপন না করার কারণে শিল্প বর্জ্য দ্বারা নদীদূষণ বন্ধ হবে। কারণ শিল্প বর্জ্যই নদীদূষণের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত। তাই নদী রক্ষায় সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

ঢাকা