দ্বন্দ্ব-সংঘাত রোধে সামাজিক বুদ্ধিমত্তা

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২১, ২২:৪০

দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুরোধে রাষ্ট্রীয় তত্পরতা থাকলেও দ্বন্দ্ব নিরসনে ব্যক্তি পর্যায়ে সামাজিক বুদ্ধিমত্তার (সোশ্যাল ইন্টিলিজেন্স) ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক বুদ্ধিমত্তার ধারণাটি আমরা যদি দুই ভাবে ভাগ করি তাহলে দেখা যায় এটা (ক) বিভিন্ন মানসিক সিদ্ধান্তের অনুমান ও মেনে নেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। (খ) আবার এটা দক্ষতার একটি অংশ যা বিভিন্ন সামাজিক ঘটনা ও প্রেক্ষাপটে কীভাবে ব্যক্তিকে অংশগ্রহণ করতে হয় তা নির্দেশ করে। দক্ষতার এই দ্বিতীয় অংশটি ব্যক্তিকে তার সামাজিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে সহায়তা করে, যার মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতিতে অন্যের অনুভূতি, চিন্তাভাবনা এবং আচরণ বোঝার দক্ষতাও অন্তর্ভুক্ত। আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি বা দলগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে সামাজিক বুদ্ধিমত্তার অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো আমাদের মধ্যে উপস্থিত থাকা খুবই জরুরি বলে মনে করছি।

মনোবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড থর্নডাইক সামাজিক অন্তর্দৃষ্টি উপলব্ধি করেছিলেন এবং তিন ধরনের বুদ্ধির কথা বলেন যেমন—বিমূর্ত, যান্ত্রিক এবং সামাজিক। তিনি সামাজিক বুদ্ধিমত্তাকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছেন এটা একজন ব্যক্তির সঙ্গে আরেকজন ব্যক্তির যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা; এটা অপরকে বুঝতে পারার দক্ষতা এবং সামাজিক পরিস্থিতিতে অন্যদের সঙ্গে আচরণগত দক্ষতা। থর্নডাইক (১৯২০) উল্লেখ করেছেন, ‘সামাজিক বুদ্ধির অভাবে কোনো কারখানার সেরা মেকানিক ফোরম্যান হিসেবে ব্যর্থ হতে পারে।’ এটি মানুষের ভালোবাসা, আনুগত্য এবং অংশীদারিত্ব অনুভব করার এবং তাদের জীবনের দিক ও ক্রিয়াকলাপ পরিচালনা করার প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করে। ১৯৪৩ সালে আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম হ্যারল্ড মাসলো তার তত্ত্বে মানুষের প্রয়োজনের পিরামিডে এই ধারণাটি উপস্থাপন করেছেন, যেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে সাধারণভাবে মানুষেরা নিজের মধ্যে একনিষ্ঠতা, আনুগত্য এবং প্রেমের প্রয়োজন বোধ করে। এই প্রয়োজন তাকে সংবেদনশীল সমর্থন এবং আত্মবিশ্বাস প্রদান করবে। অন্যদিকে, লোকেরা যখন দক্ষতার সঙ্গে তাদের প্রয়োজনীয়তা না পান, তখন তারা আরো উদ্বিগ্ন, হতাশাগ্রস্ত এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। এই উদ্বেগ ও হতাশা মানুষকে খুন করার মতো জঘন্য কাজে প্ররোচিত করতে পারে। সংঘাত ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুরোধে আমাদের মধ্যে সামাজিক বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটানোর প্রবল প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।

অনেক বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকরা মনে করেন সামাজিক বুদ্ধিমত্তার বিকাশে কিছু সামাজিক উপাদান অবদান রাখে। সে গুলো হলো—

১. সামাজিকীকরণ: মানুষের সামাজিকীকরণ মূলত পরিবার থেকেই শুরু হয়। একটি ভালো সামাজিকীকরণ সামাজিক অবদান এবং সামাজিক মান শেখানোর পদ্ধতি যা দ্বারা ব্যক্তিকে নিজের এবং অন্যের প্রতি তার দায়বদ্ধতাবোধ সম্পর্কে জ্ঞাত করে তোলা হয়। এই ভূমিকাগুলো ব্যক্তিকে গ্রহণযোগ্য সামাজিক আচরণের দিকে পরিচালিত করে।

২. সামাজিক যোগাযোগ বা মিথস্ক্রিয়া :সামাজিক মিথস্ক্রিয়া মূল্যবোধ, রীতিনীতি এবং দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত হতে পারে এবং এই পদ্ধতিতে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী সামাজিক সম্পর্কের সংগঠিত বিভিন্ন আচরণের নিদর্শনগুলো শিখতে পারে। এর ফলে যে কোনো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যক্তির আচরণ সামাজিক মূল্যবোধ ও প্রচলিত রীতিনীতি দ্বারা নির্ধারিত হয় ।

৩. ডিলিংয়ের নমনীয়তা :আমাদের সমাজে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যোগাযোগ, বিনিময় বা লেনদেনের ক্ষেত্রে আচরণগত নমনীয়তা। নমনীয় আচরণ গুণাবলি কোনো মানুষের মধ্যে থাকলে যে কোনো সামাজিক পরিস্থিতির মোকাবিলায় আচরণ করার ক্ষেত্রে সে যাচাইকরণ বা চিন্তাভাবনা করে সামাজিক বাধ্যবাধকতা ও মূল্যবোধ দ্বারা বিচার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।

৪. গ্রহণযোগ্যতা :অন্যের প্রতি ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি তার সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি গড়তে সাহায্য করে, এছাড়াও অন্যকে বোঝা ও ভালোবাসা, অন্যের প্রতি সহানুভূতি এবং তাদের স্বাচ্ছন্দ্য এবং কল্যাণে আগ্রহী হওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা নির্ধারণ করে।

সোহেল রানাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। তার রেখে যাওয়া সন্তানদের কি হবে আমরা তাও বলতে পারি না। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আমাদেরকে যাতে আর দেখতে না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে রাষ্ট্রের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। পাশাপাশি পারিবারিক পর্যায়ে সামাজিক বুদ্ধিমত্তার বিকাশে পিতামাতা ও অভিভাবকদের কার্যকরি ভূমিকা পালনের উদাত্ত আহ্বান রাখছি। সবকিছু মিলে আমরা সামাজিকভাবে বুদ্ধিমান ও দক্ষ মানুষ দেখতে চাই। তাহলেই মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পর্ক ভালো হবে এবং সমাজে দ্বন্দ্ব সংঘাত কমবে।

n লেখক :প্রাক্তন শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়